কখনও কখনও মানুষ শুধু দেখা করার জন্য একত্র হয় না—তারা ফিরে আসে নিজেদের ভেতরের কোনো পুরোনো ডাকে সাড়া দিতে। ক্যানবেরায় ১০ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৬ অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশি গ্লোবাল মেরিনার্স রিইউনিয়ন ২০২৬” ছিল তেমনই এক পুনর্মিলন—যেখানে সময়, দূরত্ব আর মহাদেশ পেরিয়ে মানুষগুলো আবারও এক হয়েছিল সমুদ্রের টানে।
অস্ট্রেলিয়ার রাজধানীর সানডাউন ভিলা যেন সেই কয়েক দিনের জন্য হয়ে উঠেছিল এক ভিন্ন জগৎ—যেখানে ভাষা একটাই, স্মৃতি একটাই, আর অনুভূতির নাম ছিল “সমুদ্র”। বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান মেরিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (BAMA)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই মহামিলনমেলায় যুক্ত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশ, কানাডা, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ডসহ সাতটি দেশের প্রবাসী মেরিনার ও তাদের পরিবার—মোট ১০৫টি পরিবার, প্রায় ৩৫০ জন মানুষ।
সমুদ্রজীবনের মানুষদের কাছে দূরত্ব নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই দূরত্বই যেন তাদের একত্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে আরও গভীর করে তোলে। তাই ক্যানবেরার এই পুনর্মিলনী শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না—এটি ছিল এক আবেগের প্রত্যাবর্তন, এক অদৃশ্য নোঙর ছুঁয়ে ফেরার গল্প।
প্রথম দিনের নীরব সূচনা শুরু হয়েছিল নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে—যেখানে প্রয়াত ও অসুস্থ সহকর্মীদের স্মরণ করা হয়। সেই মুহূর্তে উৎসবের আড়ালে উঁকি দেয় জীবনের আরেকটি সত্য—সমুদ্র যেমন বিস্তৃত, তেমনি তার মানুষের জীবনও ভাঙা-গড়ার এক অনন্ত প্রবাহ।
পরের দিনগুলোতে সেই আবেগ রূপ নেয় উচ্ছ্বাসে। খেলাধুলা, কুইজ, ফটোসেশন, বারবিকিউ, আর সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে ক্যানবেরা যেন পরিণত হয়েছিল এক ছোট্ট বাংলাদেশে। রাতের আড্ডাগুলো, যেখানে ঝালমুড়ির স্বাদ আর গান মিশে যেত হাসি-গল্পে, সেগুলো ছিল সবচেয়ে নিঃশব্দ কিন্তু সবচেয়ে গভীর বন্ধনের মুহূর্ত।
তৃতীয় দিনে যখন শহর ভ্রমণ আর আড্ডার ফাঁকে সময় ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছিল, তখন কোথাও যেন এক অজানা বিষণ্নতা ভর করেছিল সবার মনে। ফরমাল ডিনার, পুরস্কার বিতরণ আর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—সবই ছিল উদযাপন, কিন্তু তার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বিদায়ের ছায়া।\
শেষ দিনে, বিদায়ী দোয়া আর শেষ ফটোসেশনে এসে সেই ছায়া পরিণত হয়েছিল এক নীরব শূন্যতায়। চার দিনের জন্য গড়ে ওঠা এই অস্থায়ী পরিবার ভেঙে গেলেও, রেখে গেল কিছু অদৃশ্য বন্ধন—যা সহজে ছিঁড়ে যায় না।
আয়োজনে ছিল স্বাদের এক ভিন্ন মাত্রাও—টার্কিশ, ওরিয়েন্টাল এবং ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খাবারের সমন্বয়ে গড়া এক আন্তর্জাতিক স্বাদের টেবিল, যা যেন সংস্কৃতির ভেতরেও এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল।
তবুও এই আয়োজনের আসল প্রাপ্তি কোনো খাবার বা অনুষ্ঠান ছিল না—ছিল মানুষগুলো। যারা সমুদ্র ছেড়ে স্থলে এলেও, হৃদয়ের কোথাও আজও বহন করে সেই নীল দিগন্তের ডাক। BAMA-এর এই উদ্যোগ তাদের সেই ডাককে একসাথে শোনার, ভাগ করে নেওয়ার এবং নতুন করে অনুভব করার সুযোগ করে দিয়েছে।
ক্যানবেরার সেই চার দিন তাই শুধু একটি রিইউনিয়ন ছিল না—ছিল স্মৃতির পুনর্জন্ম, সম্পর্কের পুনর্গঠন, আর সমুদ্রের মানুষের অন্তরে থাকা নীরব ঢেউয়ের এক সম্মিলিত প্রতিধ্বনি।
দূর পরবাস: গ্লোবাল বাংলাদেশি মেরিনার্স রিইউনিয়ন ২০২৬ নিয়ে ফিরোজ আলী (২০ন)-এর বিশেষ লেখা
Link: বাংলাদেশি গ্লোবাল মেরিনার্স রিইউনিয়ন ২০২৬ | নাগরিক সংবাদ
অনলাইন নিউজ পোর্টাল: সিডনি প্রতিদিন – বাংলাদেশি গ্লোবাল মেরিনার্স রিইউনিয়ন ২০২৬




Leave a comment