Home Articles জল থেকে তেল – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)
ArticlesRefayet Amin

জল থেকে তেল – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

আর যদি কোনভাবে ভুলে বিল্‌জের পানি বের হয়, তাহলে কিন্তু সেই তেলের হাল্কাধারা (oil sheen) জাহাজের গতিপথে থেকে যেতে পারে। হেলিকপ্টার বা অন্য জাহাজ থেকে সহজেই বুঝা যাবে, কোন্‌ জাহাজের ময়লা তেল। চরম বিপদ হবে তখন। তবে পরিবেশ রক্ষা না করলে তো আমরা সারা দুনিয়াকেই চরম বিপদের দিকে ঠেলে দিবো, তাইনা?

আগের এক লেখায় জল থেকে কীভাবে জল বানায় লিখেছি। তারপরে লিখেছি তেল থেকে কীভাবে জল বের হয়। আর আজকে জল থেকে তেল বের করি – কী বলেন? বিশ্বাস করুন, সবই সম্ভব। একটু টাকা ঢালুন, তেলপানি খরচ করুন, আমি তেল থেকে জল বা জল থেকে তেল সবই বের করে দিবো, কোনো ভকিচকি নাই এখানে।

প্রথমেই তাহলে ইঞ্জিনরুমের একটা অবাঞ্ছিত কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জায়গা বিল্‌জ্‌ (bilge)-এর সঙ্গে পরিচিত হই। জাহাজকে যদি পানির বদলে শুকনা মাটির উপরে দাড় করাতে পারেন, তাহলে, সবচেয়ে তলার যেই জায়গাটা মাটিতে ঠেকবে, তাকেই বিল্‌জ্‌ বলে। মানে, জাহাজের দুই সাইডের দেওয়াল দুইদিক থেকে নেমে এসে একদম তলায় যেখানে জোড় লেগেছে, সেই তলানীটাকে বিল্‌জ্‌ বলে। আগেকারযুগের কাঠের জাহাজে, সেই জায়গায় একটা শক্তপোক্ত মোটা কাঠ থাকতো, নাম কীল (keel); আধুনিক জাহাজে মোটা স্টীলপ্লেট বা স্টীলবার দেয়। এতো গেলো বাইরের দিকের কথা, কিন্তু ভিতর বলেও তো একটা দিক আছে। জাহাজের খোলের ভিতরের দিকে, ইঞ্জিনরুমের সবচেয়ে তলায় যেই স্থান, সেটাকেও বিল্‌জ্‌ বলে এবং সেখান থেকেই আমার আজকের লেখা শুরু করি।

Bilge System

ইঞ্জিনরুমের বিল্‌জ্‌ একটা জঘন্য জায়গা – এটাকে মিউনিসিপ্যালিটির নালাও বলতে পারেন। দুনিয়ায় এর জন্ম না হলেই আমরা শান্তি পেতাম। এখানে জাহাজের তাবৎ জিনিস এসে জড় হয়। পারফেক্ট-লাইফে বিল্‌জ্‌ থাকবে ঝক্‌ঝকা-ফক্‌ফকা; কিন্তু দুনিয়া তো পারফেক্ট না। আর ইঞ্জিনরুম তো যা-তা। চারিদিকে পাম্প-ইঞ্জিন চলছে, সেগুলোর থেকে পানি বা তেল লীক করতেই পারে। চারিদিকে শতশত পাইপ – তেল-পানি-স্টীমের জন্যে, সেগুলোতেও জায়গায় জায়গায় লীক হতে পারে। এগুলোতো সাধারণ লীক, এরমাঝে হয়তো কখনো বিশাল একটা পাইপ বার্স্ট করে প্রচুর পানি বা তেল পড়ে গেলো। ইঞ্জিনরুমের এসমস্তকিছুই যায় সেই বিল্‌জে। আমরা বলি বিল্‌জ্‌-ওয়াটার – বিদ্ঘুটে সেই মিশ্রণে তেল-লোনাপানি-মিষ্টিপানি-জ্বালানী-কেমিক্যাল-লুব-অয়েল সবকিছুই থাকে। সিগারেটের টুকরা, পেন-পেন্সিল, ময়লা মুছার কাপড়-ত্যানা, নাট-বল্টু-স্ক্রু, গুরুত্বপূর্ন ইঞ্জিনিয়ারিং-ড্রয়িং বা ক্যালকুলেশানের কাগজ, মেশিনের ম্যানুয়াল, ডিউটি-রোস্টার, আপনার হারানো সিকিটা-আধুলিটা সবই ঐ বিল্‌জের পানিতেই পাবেন। ইঞ্জিনরুমের সবকিছুর ড্রেনেজই (বাথরুম ছাড়া) কয়েকটা গর্ত বা গহ্বর টাইপের বিল্‌জ্‌-ওয়েল (bilge-well)-এ এসে জমা হয়। বেশী জমে গেলে, ওয়েল থেকে উপচে উঠে, প্ল্যাটফর্মের উপরে জোয়ার-ভাটার মত বইতে থাকে।

দেশী কাঠের নৌকায় দেখবেন পায়ের কাছে পানি ছলাৎ-ছলাৎ করছে। বিল্‌জ্‌ কিছুটা সেইরকমই চিন্তা করতে পারেন। পার্থক্য হলো – নৌকায় কাঠের মাঝের ফাঁক বা ছিদ্র দিয়ে নদী বা সমুদ্রের পানি ঢুকে, (এবং সেগুলো মোটামুটি পরিষ্কার পানি)। বেশী ঢুকার আগেই সেচ করে বাইরে না ফেললে নৌকা বেসামাল হয়ে যাবে; বা স্ট্যাবিলিটি হারিয়ে ডুবে যেতে পারে। আর জাহাজের বিল্‌জে জমা হয় ইঞ্জিনরুমের সব ময়লা পানি-তেল-কেমিক্যাল। নৌকা থেকে তো পানি সেচে বাইরে ফেলে দিলেন, ইঞ্জিনরুমের বিল্‌জ্‌ কী করবেন? আগেকার যুগে বাইরেই ফেলা হতো। কিন্তু এর ফলে সমুদ্রের ও পরিবেশের ভীষণ ভীষণ ক্ষতি হয়ে গিয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তাই সেটা থামাতে হবে; এখন আর হুট করে বাইরে ফেলা যাবে না। ফেলা উচিৎও না। চিন্তা করে দেখেন, হাজার হাজার জাহাজ যদি টনে টনে ময়লা তেল-পানি-কেমিক্যাল সমুদ্রে ফেলতেই থাকে, তাহলে পরিবেশ কতটুকু পরিষ্কার থাকবে? আমাদের বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কী হবে?

এখন আসুন, আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা সম্পর্কে অল্প একটু জেনে নেই। ইন্টারন্যাশানাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশান (IMO)-র অধীনে, সমুদ্রে দূষণ কমানোর লক্ষ্যে MARPOL (Maritame Pollution) কনভেনশান হয়। এরপরে আস্তে আস্তে জাহাজে যত ধরনের দূষণ সম্ভব সেগুলো নিয়ে রেগুলেশান তৈরী করে – তেলের ট্যাংকার, কেমিক্যাল ও বর্জ্যপদার্থ, ব্যালাস্ট, বায়ুদূষণ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের আজকের বিষয়টি MARPOL-এর Annex-I কভার করেছে। তেলবাহী ট্যাঙ্কার জাহাজের জন্য বেশী প্রযোজ্য; এছাড়াও মেরিটাইম এক্সিডেন্ট বা অয়েল-পলিউশান ঠেকাতে এটার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানেই বলেছে সমুদ্রে বিল্‌জ্‌-ওয়াটার ফেলা যাবে না। নিয়মকানুন মেনে না চললে, জাহাজ আটক, কোম্পানিকে পেনাল্টি, ক্যাপ্টেন-চীফ ইঞ্জিনিয়ারসহ দোষী ব্যক্তিদের জেল-জরিমানা – সবকিছুরই সম্ভাবনা আছে।

এবারে আসুন পিপিএম (ppm – parts per million) বুঝার চেষ্টা করি। খুবই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনকিছুর পরিমাপের জন্যে এর ব্যবহার হয়। আপনি যদি এক মিলিয়ন পানির ফোটার মধ্যে এক ফোটা তেল (বা অন্যকিছু) মিশান, তাহলে সেটাকে এক পিপিএম বলবো। একটা ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করি – এক মিলিয়ন (১,০০০,০০০) পানির ফোটা প্রায় ৫০ লিটার (বা ১৩.২ গ্যালন)। বাসায় যদি কোন বোতল থাকে সেটা কত লিটার দেখে নিয়ে, পঞ্চাশ লিটারের বোতলে কী পরিমান পানি ধরবে তার আন্দাজ করে নিতে পারেন। সেই পঞ্চাশ লিটারে মাত্র আর এক ফোটা তেল দিলে, আপনি বলতে পারবেন – এই বোতলে এক পিপিএম তেল আছে। আর পনেরোটা ফোটা দিলে বলবেন ফিফটিন পিপিএম – এটা আসলে পানির পরিমাণ হিসাবে খুবই অল্প পরিমাণ তেল। মারপোলের আইন অনুযায়ী জাহাজ থেকে ১৫ পিপিএম-এর বেশী তেল কোনোভাবেই সমুদ্রে ফেলা যাবে না।

আচ্ছা আইন তো বানালো, কিন্তু আমরা সেটা পালন করবো কীভাবে? বিল্‌জে তো তেল-পানি-কেমিক্যালের শরবত অলরেডি মিক্স্‌ড্‌ হয়ে গেছে। উপায় হলো OWS (Oily-Water Separator)। এই মেশিনে চেষ্টা করা হয় তেল আর পানিকে আলাদা করতে, এবং পানি পরিষ্কার হলে (১৫ পিপিএম-এর কম), সমুদ্রে ফেলা যাবে।

Oily Water separator

তেল হাল্কা বলে পানিতে ভাসে। একটা বোতলে তেল-পানির মিশ্রণ অনেকক্ষণ রেখে দিলে, তেল ভেসে উঠবে, পানি নীচে থাকবে – এই বৈশিষ্ট্যকেই কাজে লাগানো হয়। উপর থেকে তেলের লেয়ারকে আস্তে করে অন্যপাত্রে ঢেলে নেওয়া যেতে পারে (decanting)। জাহাজের বিল্‌জ্‌ থেকে সেই ময়লা মিশ্রণকে স্ট্রেইনার/ফিল্টারের মাঝ দিয়ে নিয়ে পাম্প করে OWS-এর প্রথম-স্টেজে নেওয়া হয়। স্ট্রেইনার/ফিল্টারের কাজ হলো বড়সড় জিনিসগুলোকে (কাপড়-ত্যানা-কাগজ ইত্যাদি) প্রথম সুযোগেই আলাদা করে ফেলবে, OWS-এ যেতে দিবে না। প্রথম-স্টেজের ভিতরে কিছু প্লেট থাকে (baffle-plates), যেগুলো তেল আর পানিকে আলাদা হতে সাহায্য করে। আস্তে আস্তে তেল উপরের দিকে ভেসে উঠে জমতে থাকে। একপর্যায়ে একটা সেন্সর সিগ্ন্যাল দেয় যে, অনেক তেল জমেছে, তখন উপরের দিকে একটা ভাল্ভ খুলে গিয়ে তেলকে একটা কালেক্টিং-ট্যাঙ্কে জমা করে। অন্যদিকে তলার থেকে পানিকে সেকেন্ড-স্টেজে নিয়ে যাওয়া হয়। এবারে এখানে “দল-পাকানোর থিওরি” খাটিয়ে কাজ হাসিল করা হয়। Coalescer Filter বলে এক ধরনের ফিল্টার আছে, যেগুলোতে তেলের ছোট ছোট বুদবুদ জমা হতে হতে একটা বড় বুদবুদ তৈরী হয়, মানে কয়েকটা বুদবুদ মিলে দল পাকিয়ে বড় হয় – এই প্রসেসটাকেই কোয়ালেসিং (coalescing) বলে। সেই বড় বুদবুদ আবারো উপরে ভেসে উঠলে, সেটাকেও আগেরবারের মত কালেক্টিং-ট্যাঙ্কে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়-স্টেজের তলার দিকে মোটামুটি পরিষ্কার পানিকে একটা বিশেষ স্ক্যানারের (oil content monitor) মাঝ দিয়ে নিয়ে সমুদ্রে ফেলা হয়। এই স্ক্যানারটা খুবই ইম্পরট্যান্ট; কারণ এটাই মনিটর করতে থাকে যেই পানি আমরা সমুদ্রে ফেলছি, সেটায় ১৫ পিপিএম-এর বেশী তেল আছে কিনা। পনেরোর একটু উপরে গেলেই, এলার্ম চলে আসবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের দিকের ভাল্ভ বন্ধ হয়ে সেই পানিকে ঘুরিয়ে দিবে বিল্‌জ্‌ হোল্ডিং ট্যাঙ্কের দিকে। একটুও যাতে দূষণ ঘটাতে না পারে। এই স্ক্যানারটা সেজন্যে সবসময়েই সঠিকভাবে কাজ করে কিনা তার দিকে খেয়াল রাখতে হয়; প্রায়শই টেস্ট করিয়ে সার্টিফাই করিয়ে নিতে হয়। আর কখনোই অবৈধ কোন উদ্দেশ্যে এটাকে বিকল করা যাবে না। পুরা সিস্টেমে জায়গায়, জায়গায় অনেকগুলো ফিল্টার থাকে – যত ফিল্টার, ততই পরিষ্কার।

জাহাজে OWS চালানোর পুরা বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সকলকেই সবধরনের সতর্কতা অবশ্যই মেনে চলতে হয়, যাতে করে কোন পরিবেশ-দূষণ না ঘটে। চীফ ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্বে অয়েল-রেকর্ড বুক বলে লগ বই আছে, সেটায় এর অপেরাশানের খুঁটিনাটি, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রেকর্ড করতে হয়। জাহাজের পজিশান, স্থলসীমার থেকে দূরত্ব, শুরু ও শেষ করার সময়, কত পরিমাণ বাইরে বের হলো তার পরিমাণ, ১৫ পিপিএম-এর রেকর্ড, কোড নাম্বার – তাবৎ সবকিছু। আর যদি কোনভাবে ভুলে বিল্‌জের পানি বের হয়, তাহলে কিন্তু সেই তেলের হাল্কাধারা (oil sheen) জাহাজের গতিপথে থেকে যেতে পারে। হেলিকপ্টার বা অন্য জাহাজ থেকে সহজেই বুঝা যাবে, কোন্‌ জাহাজের ময়লা তেল। চরম বিপদ হবে তখন। তবে পরিবেশ রক্ষা না করলে তো আমরা সারা দুনিয়াকেই চরম বিপদের দিকে ঠেলে দিবো, তাইনা?

জল থেকে তেল

আমার একটা অনুরোধ – কারো যদি কোনো বিষয়ে কোনো কৌতুহল থাকে, তাহলে আমাকে refayet@yahoo.com ই-মেইলে যোগাযোগ করতে পারেন।
টলিডো, ওহাইও, ২০২২

COMPILED BY
A.K.M Jamal Uddin

28th Batch, Marine Academy Bangladesh.

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

Recent Posts

[Not a valid template]

Related Articles

শহীদ মিনারের জয় – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

তারপরে এলো সেই চরমক্ষণ। স্টল সাজানীতে বিজয়ী দলের নাম। দ্বিতীয় হলো ভারত;...

গরম তেলের ঝলসানি – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

অন্যান্য সবদিনের মতই, সেদিনও ইঞ্জিনরুমে কাজ করছি। হঠাৎ উপরে ছাদের দিকের একটা...

পানামা ক্যানাল – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

এখানে মানুষের বদলে জাহাজ; আর শুকনা ফুটপাথের বদলে দুই মহাসাগর; ওভারবীজটা হলো...

কষ্টের বাগান – সুখের বাগান: রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই) 

আমি নিজহাতে পুরুষফুল নিয়ে ডাইরেক্ট গিয়ে মিসেস ফুলের উপরে লাগিয়ে লাগিয়ে রেণু...