Home Articles পানিতে আগুন – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)
ArticlesRefayet Amin

পানিতে আগুন – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

পর্ব ১:  

বিশাল সমুদ্রের মাঝে ক্ষুদ্র একটা পিপড়ার সাইজের জাহাজে নাবিকেরা কাজ করে। জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সমুদ্রে কিছু হলে আমাদের সকলেরই জীবন-মরন সমস্যা। আমরা মেরিনাররা ঝড়ে জাহাজ ডুবে যাওয়ার ভয় পাই না, কিন্তু সবচেয়ে বেশী ভয় পাই আগুনকে। আরো অনেককিছুই আমাদের ভয়ের কারণ হতে পারে – মুখোমুখি সংঘর্ষ, আইস্‌বার্গ, মেইন ইঞ্জিন বিকল হওয়া, জাহাজে খোলে ফুটা হওয়া, বড়সড় পাম্প-মেশিনারিজ বিকল বা সেটার পাইপ বার্স্ট করা (বিশেষ করে সী-ওয়াটার লাইন বার্স্ট এবং ভাল্ভ ঠিকমত কাজ না করলে ক্রমাগত জাহাজে পানি ঢুকতেই থাকবে)। এছাড়াও অনেক কিছুরই এক্সপ্লোশানও হতে পারে – বয়লার, কম্প্রেস্‌ড্‌-এয়ার ট্যাঙ্ক, হাই-প্রেশার গরম-তেল বা গরম-পানির লাইন, আরো কতকিছু। কিন্তু সবকিছুর উপরে আগুনটাকেই ভয় করি বেশী।

একারণে নানা নিরাপত্তামুলক পদক্ষেপ অবশ্যই নেওয়া আছে। সেজন্যই জাতিসংঘের সংস্থা IMO (International Maritime Organization), SOLAS (Safety Of Life At Sea) কনভেনশানের মাধ্যমে, জাহাজের যত খুঁটিনাটি বিষয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা সম্ভব তার সবই করেছে। প্রথমেই বলে নেই – জাহাজের প্রতিটা নাবিককে অবশ্য অবশ্যই ফায়ার-ফাইটিং জানতে হবে। শুধু থিওরেটিক্যাল কোর্স আর ভিডিও দেখলেই চলবে না। ফায়ার-ফাইটারদের মত প্র্যাক্টিক্যালি হাতে-নাতে ট্রেনিং নিতেই হবে; আর কিছুদিন পরপরই তা ঝালাই করে নবায়ন করতে হবে। জাহাজে গেলেও সেখানে সকলকে সেই জাহাজের সব ফায়ার-ফাইটিং-এর জিনিসগুলো ভালোমত রপ্ত করে নিতে হবে – কোথায় কোন ফায়ার-এক্সটিংগুইশার আছে, ফায়ার-হোস, ফায়ার-পাম্প, ফায়ার-এলার্ম ইত্যাদি সবকিছু। শুধু দেখলেই চলবে না, চালাতে তো জানতে হবেই, তার উপরে সেগুলোর কার্যকারীতা ঠিক আছে কিনা, ঠিকমত ইন্সপেকশান করা, কার্যকারীতার মেয়াদের সব রেকর্ড রাখতে হবে। দরকারমত চালিয়ে দেখতে হবে, বা ফায়ার-এক্সটিংগুইশারের পুরানো কেমিক্যাল বদলাতে হবে। এছাড়া তো রয়েছে রেগুলার ফায়ার-ড্রীল। না করলে যে নিজেরাই মারা পড়বো।

সেই আদিযুগে ছিলো কাঠের জাহাজ। সেগুলোতে সহজেই আগুন ছড়িয়ে পড়তো। ধীরে ধীরে টেকনোলোজির উন্নতির সঙ্গে স্টীলের জাহাজ এসেছে, কিন্তু অন্যান্য অনেক দাহ্য-পদার্থ তো রয়ে গেছে। শুধুমাত্র আমাদের থাকবার কেবিনগুলোর কথাই চিন্তা করেন – চেয়ার-টেবিল-খাট-দেওয়াল। সেগুলোই তো যথেষ্ট। তারপরে গ্যালীতে (রান্নাঘরে) তেল, ইঞ্জিনরুমে জ্বালানী-তেল, আবার কখনো এমন কিছু কার্গো থাকতে পারে যেগুলো নিজেরাই সুপার-জ্বালানী। যেমন – তেল, কেমিক্যাল, এসিড, কয়লা, তুলা, পাট, কাপড়-চোপড়, ফার্নিচার কী না? সবকিছুই আগুনের পেটে যেতে রেডি, এবং আগুনকে চরমভাবে উস্‌কে দিবে। তারপরেও সবদিক চিন্তা ভাবনা করে চেষ্টা করা হয়, কীভাবে কী করলে আগুন লাগবে না; অথবা লাগলেও ছড়াবে না, বা তাড়াতাড়ি নিভিয়ে ফেলা যাবে।

আগুন জ্বলতে তিনটা জিনিস লাগে, যাকে বলা হয় Fire Triangle – অক্সিজেন + জ্বালানী (fuel – পুড়বে এমন জিনিস) + গরমতাপ (heat)। এই তিনের মধ্য থেকে একটাকে সরিয়ে নিতে পারলেই আগুন নিভে যাবে। বাতাসে অক্সিজেন থাকে, আর দকার জ্বালানী (কাঠ, তেল, কাপড়, যেকোনকিছুই যা আগুনে জ্বলে); আর দরকার টেম্পারেচার। আগুন লাগলে অনেক সময়েই একটা মোটা কম্বল দিয়ে সম্পূর্ণটা ঢেকে দিতে পারলে, অক্সিজেনের অভাবে আগুন নিভে যায়। একই কারণে, মোমবাতি একটা বোয়ামে ভরে ঢাকনা বন্ধ করে দিলে নিভে যাবে। আবার, আগুন থেকে জ্বালানী সরাতে পারলেও ভালো। উদাহরণ – লাকড়ির-চুলার লাকড়ি সরিয়ে ফেললে, আগুন ধীরে ধীরে নিভে যাবে। একইভাবে, বনে-জঙ্গলে দাবানল হলে অনেক সময়ে প্ল্যান করে আগুনের গতিপথের দিকের গাছপালা (জ্বালানী) কেটে ফেললে, আগুন আর বাড়তে পারে না। অনেক সময়ে শুকনো লতা-গুল্ম পুড়িয়ে ফেলে। সেজন্যই বলে – fighting fire with fire.

MV Wan Hai 503, container ship off the coast of Kerala, India, June 9, 2025; Source: CNN.

আমরা তো সকলেই জানি তেল পানির উপরে ভাসে, তাই সেটা নিভানোও বেশ কষ্টের। তারপরে ফায়ার-এক্সটিংগুশার এক একটা একেক প্রকারের এবং একেক ধরনের আগুনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এদের ক্লাস থাকে – Class A, B, C ইত্যাদি। লোকেশান অনুযায়ি সেগুলো রাখা থাকে, তেলের আগুন নেভানোর জন্য গ্যালীতে, জ্বালানী তেলের জন্য ইঞ্জিনরুমে। ইলেক্ট্রিক্যাল আগুন নিভানোর জন্য ড্রাই-পাউডার।

আমাদের কেবিনগুলোর দেওয়াল-ফার্নিচার থাকে ফায়ার-রিটার্ডেন্ট যাতে সহজে না জ্বলে বা আগুন লাগলেও অনেক সময় নিবে। সেগুলোর রেইটিং দেওয়া থাকে – একটা থাকে কোন্‌ ধরনের আগুন (Class A, B, C); অন্যটা সময়ের রেইটিং (Class A-60, Class A-30, Class A-15) মানে কতক্ষণ সেই আগুনের মাঝে টিকে থাকবে – একঘন্টা বা তিরিশ মিনিট বা পনের মিনিট। এবারে জাহাজের মেইন স্ট্রাকচারের কথা বলি। জাহাজের খোলটাকে বাম-থেকে ডানে আড়াআড়িভাবে বেশ কয়েকটা শক্ত দেওয়াল বা বাল্কহেড (bulkhead) দিয়ে ভাগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু থাকে ওয়াটারটাইট-বাল্কহেড থাকে আর থাকে ফায়ারপ্রুফ-বাল্কহেড। সবচেয়ে সামনের দিকে থাকে কলিশন-বাল্কহেড। সামনাসামনি কোন কিছুতে গোঁত্তা খেলে, বা অন্য জাহাজ মেরে দিলে, যদি জাহাজে ফুটা হয়, তাহলে পানি শুধু সেই বাল্কহেড পর্যন্তই থাকবে। পুরা জাহাজে ঢুকবে না। এরকম বেশ কয়েকটা বাল্কহেড দিয়ে জাহাজকে আড়াআড়ি আর লম্বালম্বি ভাগ করা হয়েছে। এগুলো থাকার কারনেই, জাহাজের খোলে একটা ফুটা হলেও ডুবতে অনেক সময় লাগে; বা পানি যেদিকে ঢুকছে, সেই জায়গাটাকে আইসোলেট করে রাখা সম্ভব হয়। এদের মধ্যে অনেকগুলোই আছে ফায়ারপ্রুফ বাল্কহেড, শুধু পানিই না, আগুনও ছড়াতে দিবে না। বা আগুন ছড়াতে দেরী করাবে।

জাহাজে আগুন নিভানো হয় কীভাবে? সহজ উত্তর হলো, জাহাজ তো পানির উপরেই, সুতরাং পানির তো আর অভাব নাই – সমুদ্র বা নদী থেকে পাম্প করে আগুন নিভানো যাবে। হ্যা, তা বটে, কিন্তু, তারপরেও অনেক কিন্তু থেকে যায়। যেই পাম্প দিয়ে পানি তুলে আগুন নিভাবো, সেইটাতেই যদি আগুন লাগে? বা সেইটা যদি নষ্ট থাকে? কাজ করছেনা বা তার কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। অথবা জাহাজ এমনভাবে চড়ায় আটকে গেছে, বা কাৎ হয়ে গেছে, যে সেই পাম্প পানির নাগাল পাচ্ছে না। তাহলে? তার ব্যবস্থাও চিন্তা করা আছে – দ্বিতীয় আর একটা পাম্প থাকবে স্ট্যান্ডবাই বা ডুপ্লিকেট হিসাবে। কোনো কোনো জাহাজে, দুইটার চেয়েও বেশী থাকে। নর্মাল অন্যান্য কাজে যেসমস্ত পাম্প ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর সঙ্গেও ফায়ার-লাইনের ইন্টার-কানেকশান দেওয়া থাকে। ইমার্জেন্সীতে প্রয়োজন হলে সেগুলোকেও ব্যবহার করা যাবে।

আচ্ছা, জাহাজের প্রায় সব পাম্পই তো থাকে ইঞ্জিনরুমে। যদি ইঞ্জিনরুমেই আগুন লাগে? অথবা ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই দেয় যেই জেনারেটরগুলো, সেগুলো যদি না চলে, তাহলে? সেজন্যই থাকে ইমার্জেন্সী জেনারেটর এবং ইমার্জেন্সী ফায়ার-পাম্প। এগুলো অবশ্য অবশ্যই ইঞ্জিনরুম থেকে অনেক দূরে থাকতে হবে; যাতে করে জাহাজের একজায়গায় আগুন ধরলেও অন্য জায়গারটাকে ব্যবহার করা যাবে। ইমার্জেন্সী ফায়ার-পাম্প রেগুলার ইলেক্ট্রিক্যাল লাইন থেকে সাপ্লাই নিলেও নিতে পারে; কিন্তু বাধ্যতামুলক হচ্ছে – সেটা অবশ্যই ইমার্জেন্সী জেনারেটর বা ব্যাটারী-পাওয়ারের সঙ্গে কানেক্টেড থাকতেই হবে। কারণ ইমার্জেন্সীর সময়ে রেগুলার কারেন্ট না পেলে, হয় ব্যাটারীতে চলবে অথবা ইমার্জেন্সী জেনারেটরে চলবে।

আমি তো মাত্র অল্প কিছু বললাম, কিন্তু SOLAS কনভেনশানের গাইডলাইনে এগুলোর প্রতিটার ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা দেওয়া আছে – পাইপের সাইজ, পাম্পের ধরন, ক্যাপাসিটি, লোকেশান ইত্যাদি ইত্যাদি। সেগুলোকে কিছুদিন পরপরই চালিয়ে পরখ করে দেখে নিতে হবে, আসল ইমার্জেন্সীর সময়ে চলবে কিনা। ইমার্জেন্সী জেনারেটরে সবসময়ই সঠিক লেভেলে তেল আছে কিনা চেক করতে হবে। বিপদের সময়ে সেদিকে সময় ব্যয় হয়ে গেলে আগুন সহজেই ছড়িয়ে পড়বে। তখন প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান।

আজকের আগুন এখান পর্যন্তই থাক। আগামী পর্বে আবারো আগুন ধরিয়ে কিছু আলোচনা করা যাবে। কী বলেন?


পর্ব – ২:

জাহাজে আগুন ধরে কীভাবে? গতসপ্তাহে বলেছিলাম, ফায়ার-ট্রায়াঙ্গেলের কথা – অক্সিজেন + জ্বালানী + তাপ। এই তিনটা একসাথে পেলেই আগুন জ্বলবে। এর থেকে কোনোমতে একটাকে সরিয়ে ফেলতে পারলেই আগুন নিভে যাবে। বাতাসে অক্সিজেনের তো অভাব নাই। তাই অন্য দুইটা কীভাবে আসতে পারে? চিন্তা করি, তাহলেই বুঝবেন আগুন ধরে কীভাবে।

গ্যালী (বা কিচেনে), গরম তেল থাকে। আর সমুদ্রের মাঝে জাহাজ তো দুলবেই। সবসময়ে না হোক, গরম তেল জাহাজের দোলুনীতে ছিটকে হট-প্লেট বা চুলার উপরে পড়ে আগুনের শুরু হতে পারে। অসতর্কভাবে রাখা কাপড়ে আগুন ধরতে পারে। চুলার উপরের এক্সহোস্ট ফ্যান এবং গ্রীল পরিষ্কার না করলে, তেল জমে জমে সুন্দর একটা জ্বালানী হতে পারে। সেটা চুলার তাপ পেলেই যথেষ্ট, অক্সিজেন তো বাতাসে আছেই।

বিছানায় সিগারেট খাওয়া একটা বিপজ্জনক অভ্যাস; যেকোন মুহুর্তে ঘুমিয়ে পড়লে, সেই জ্বলন্ত সিগারেট ম্যাট্রেসে-কাপড়ে লেগে আগুন ছড়িয়ে দিবে। পোর্টেবল হীটার ঠিকমত না রাখলে, হঠাৎ উল্টে গিয়ে কাপড়ে, সোফাতে, কার্পেটে আগুন ছড়াবে। অনেকেই হিটারের উপরে কাপড় শুকাতে দেয়, সেই কাপড়েও আগুন ধরে যায়।

জাহাজে যেসব কার্গো বহন করা হয় সেগুলোও দাহ্য হতে পারে। প্রকৃষ্ট উদাহরণ – তেলের ট্যাঙ্কার। এছাড়াও হতে পারে রিএক্টিভ কেমিক্যাল, সালফার, জমিতে দেওয়ার সার, কয়লা, তুলা, এমোনিয়া, আরো কতকিছু। বা নিরীহ কাপড়-চোপড়, কাঠের ফার্নিচার, বা কাঠের প্যাকিং বাক্স এগুলোই বা কম কিসে? কোনোটায় যদি কোনমতে একটু আগুন ধরে যায়, তাহলে হোল্ডের ভিতরের পাড়া-প্রতিবেশীসহ সকলকে নিয়ে জাহাজে আগুনের খেলা দেখিয়ে দিবে। কার-ক্যারিয়ার জাহাজে গাড়ীর তেলের ট্যাঙ্ক থেকে ফিউম বের হয়ে আগুন ধরার উপযোগী আবহাওয়া তৈরী করতে পারে।

আর ইঞ্জিনরুম তো কী বিপজ্জনক তা বললে আঁৎকে উঠবেন। বিশাল মেইন-ইঞ্জিন জাহাজকে চালায়, আর কয়েকটা ইলেক্ট্রিক্যাল জেনারেটর (ছোট ইঞ্জিন আরকি)। অতি উচ্চচাপে, গরম-তেল পাইপ দিয়ে ইঞ্জিনে দেওয়া হয়। সেই পাইপ যদি বার্স্ট করে, তাহলে গিয়ে পড়বে গরম ইঞ্জিনের বডির উপরে, বা তার থেকেও গরম exhaust লাইন বা ম্যানিফোল্ডের উপরে। চোখের পলকে আগুনের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ইঞ্জিনের আরো অনেক কিছু আছে, যেখান থেকে আগুন শুরু হতে পারে। তারপরে আছে বয়লার – বুঝতেই পারছেন আগুন জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে পানি গরম করে তাপ এবং চাপ দুইটাই বাড়ানো হয়। সেটার কোথায়ও যদি বার্স্ট করে তাহলে খবর আছে। বয়লারে ব্যাকফায়ার বলে একটা ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যার ফলে, আগুন বের হয়ে এসে মানুষসহ সবকিছু পুড়িয়ে দিবে। জাহাজে দুইটা বোম্ব থাকে – সত্যি সত্যি যুদ্ধের বোমা না। কিন্তু তার চাইতে কমও না। সেগুলো হলো কম্প্রেস্‌ড্‌ এয়ার-ট্যাঙ্ক। বেশ বড়সড় আকারের দুইটা ঢাউস ট্যাঙ্ক, মোটা-পুরু-শক্ত স্টীল দিয়ে মজবুত করে তৈরী। সেগুলোতে পাম্প করে করে বাতাস ভরা থাকে। মোটর-সাইকেল যেমন পায়ে কিক্‌ দিয়ে স্টার্ট দেয়, জাহাজের তিন-চারতলার সমান উঁচু ইঞ্জিন চালাতে আমাদের একটা দানব পুষতে হবে, যে কিক্‌ দিয়ে সেই ইঞ্জিন ঘুরিয়ে দিয়ে স্টার্ট দিবে। তার বদলে কম্প্রেস্‌ড্‌ এয়ার দিয়ে কিক্‌ দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কারণে যদি সেই ট্যাঙ্ক বার্স্ট করে – নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন পুরা জাহাজ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।

এছাড়াও ইঞ্জিনরুমে নানানধরনের পাম্প ও ইলেক্ট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি থাকে, যার মধ্যে প্রায় সবগুলোই চলছে। কোথায়ও কোন ত্রুটি হলেই আগুনের সম্ভাবনা। অনেক পাম্প পানির জন্যে; কিন্তু বেশ কিছু পাম্প আছে, যেগুলো তেল বা গরম তেল পাম্প করে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন কত বিপজ্জনক ব্যাপার। এগুলোর আশেপাশে সিগারেট খাওয়াও বারণ। তেল নিজে কিন্তু জ্বলে না; তেল থেকে যেই বাষ্প বের হয়, সেটাই আসলে দাহ্য। ইলেক্ট্রিক্যাল শর্ট-সার্কিট হলে তো আর কথাই নেই। জ্বালানী তেল দিয়ে তো ইঞ্জিন-জেনারেটর চলে, কিন্তু যখন সেগুলো চলে তখন বন্‌বন্‌ করে ঘুরন্ত ইঞ্জিন-মেশিন বা পাম্পের মধ্যে স্টীলের সঙ্গে স্টীলের ঘর্ষন যাতে না হয়, সেজন্য লুব্রিকেটিং অয়েল ব্যবহার করা হয়। এই লুব-অয়েল একটা পাতলা পিচ্ছিল ফিল্মের মত তৈরী করে স্টীলের দুই সারফেসকে রক্ষা করে। অয়েল না থাকলে লোহায়-লোহায় ঘর্ষনে আগুন লেগে যাবে। পর্যাপ্ত অয়েল যাতে থাকে সেজন্যে লুব-পাম্পের প্রেসার মনিটর করা হয়, কমতে থাকলেই এলার্ম বাজাবে, আর বেশী কমে গেলে, অটোমেটিক্যালি ইঞ্জিনই বন্ধ করে দিবে। আগুন লাগার থেকে, বন্ধ ইঞ্জিন ভালো।

এই কারণে, জাহাজের চারিদিকে Fire Detector এবং Fire Alarm থাকে। কোথায়ও আগুন লাগলে, ধোঁয়া বা আগুনের শিখা হবে, সেগুলোকে সেন্সর দিয়ে ডিটেক্ট করেই নিজের থেকেই এলার্ম বাজাতে পারে। অথবা, কেউ যদি আগুন দেখে, তাহলে নিজেই সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে কাছের এলার্ম ধরে টান দিয়ে এলার্ম বাজাবে। জাহাজে পানির ফ্লাড বন্ধ করার জন্য ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্ট ডোর থাকে; আর আগুন যাতে না ছড়ায়, সেজন্য থাকে ফায়ার- রেজিস্ট্যান্ট বা রিটার্ডেন্ট ডোর। মেরিনাররা সবাই ফায়ার-ফাইটিং-এ ট্রেইন্‌ড্‌; তারপরেও জাহাজে কিছুদিন পরপরই ফায়ার-ড্রিল করা হয়, সব যন্ত্রপাতি/এক্সটিংগুইশার চেক করে দেখা হয়। দুইটা গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমের কথা বলি। Water-mist Automatic Sprinkler System এবং CO2 Flooding System.

আজকাল স্প্রিঙ্কলার-সিস্টেম বড় বড় অফিস-আদালত, হোটেল, বিল্ডিং সবজায়গাতেই থাকে। ছাদে লালচে ধরনের একটা মরিচ-বাতির মত জিনিস থাকে (লাল ছাড়া অন্য রঙ্গেরও দেখবেন – রঙ দিয়ে তাদের রেইটিং বুঝানো হয়)। সেটাই সেন্সার এবং ডিটেক্ট করতে পারবে তার আশেপাশের জায়গায় আগুন লেগেছে কিনা। আগুনের আঁচে গরম হয়ে হয়ে সেই মরিচ বাতির মত জিনিসটা ঠুস্‌ করে ফেটে যাবে, আর সেটার মধ্যের পানি ঝরতে থাকবে। এর ফলে মেইন লাইনে পানি কমে গেলেই, সিস্টেমের কন্ট্রোলার টের পাবে একটা সেন্সার ফেটেছে, সঙ্গে সঙ্গে পাম্প শুরু হয়ে সেই জায়গায় পানি দিবে আগুন নিভানোর জন্যে। অটোমেটিক্যালি পাম্প শুরু হবে ও ছাদ থেকে চারিদিকে পানি ঝরতে শুরু করবে, আগুন নিভানোর জন্য। এই মরিচ-বাতির মত সেন্সরগুলো হিসাবমত, স্ট্র্যাটেজিক্যালি একটু পরপর লাগানো যাতে সব জায়গাই কভার হয়। এদের মধ্যে জোন ভাগ করা থাকে, তার ফলে আগুন কন্ট্রোল করতে সুবিধা হয়। আর অতিরিক্ত পানি যেখানে দরকার নাই, সেখানে ছিটানো হয় না। আধুনিক সিস্টেমে mist-এর বদলে Hi-Fog water, বা কুয়াশার মত করে পানি ছিটানো হয়। দুই সিস্টেমেই কিন্তু পানি ঢেলে দেওয়া হয় না। খুবই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিহি পানির কণা ছিটানো হয়। এর ফলে আগুনের উপরে পানির একটা আস্তর সৃষ্টি হয়ে বাতাসের অক্সিজেন থেকে আলাদা করে ফেলার চেষ্টা করে। আর ছোট্ট পানির কণা খুব দ্রুত তাপ কমিয়ে আনতে পারে। খুবই কার্যকরি সিস্টেম এগুলো।

আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড সিস্টেম শুধুমাত্র ইঞ্জিনরুমকে ফ্লাড করার জন্য। সেখানে যদি এমনই বড় আগুন ধরে যে, একদমই আয়ত্তে আনা যাচ্ছে না, কোনোকিছুই সম্ভব নয়, তাহলে শেষ উপায় হিসাবে সারা ইঞ্জিনরুম এই গ্যাস দিয়ে ভরিয়ে দিতে হবে – তাহলে আগুন নিভে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আগে হ্যালন নামে এক নিষ্ক্রিয় গ্যাস ব্যবহার হতো, কিন্তু সেটা পরিবেশের জন্য ভালো নয়। তাই CO2 ব্যবহার শুরু হয়েছে। একদম এক্সট্রিম কেইসে এইটা ব্যবহার হবে। শুধুমাত্র চীফ-ইঞ্জিনিয়ারের কাছে এর চাবি থাকে। প্রথমেই গণনা করে নিশ্চিত করা হয় সব মানুষ ইঞ্জিনরুম থেকে বের হয়েছে কিনা। এরপরে সব মেশিনারিজ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়, ও সব দরজা জানালা, ভেন্টিলেটর বন্ধ করে দিয়ে CO2 রিলিজ করা হয়। সেটা একটা কম্বলের আচ্ছাদনের মত আগুনকে বাতাস থেকে আলাদা করে নিভিয়ে দিবে; আর সব দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় নতুন বাতাসও ঢুকতে পারবে না। একবার CO2 ছাড়া হলে, এরপরে ইঞ্জিনরুমে আবার প্রবেশের আগে অনেকভাবে পরীক্ষা করে নিতে হবে ভিতরে ঢুকা নিরাপদ কিনা – আগুনও থাকতে পারে, আর বেশীক্ষণ এই CO2 গ্যাস নিশ্বাসে ঢুকলেও মানুষেরও ক্ষতি হবে।

বুঝতেই পারছেন, জাহাজে আগুন লাগা একটা চরম রিস্কের ব্যাপার। এনিয়ে খুঁটিনাটি অনেক প্রসংগ লেখা যায়, কিন্তু অহেতুক লম্বা ও বোরিং হয়ে যাবে। তবে মনে রাখবেন জাহাজেই হোক বা ডাঙ্গাতেই হোক, আগুন সর্বনাশা। যে যেইভাবে পারেন, চেষ্টা করবেন আগুন যাতে শুরুই না হয় সেরকম পদক্ষেপ নিতে ও সতর্ক থাকতে।


টলিডো, ওহাইও, ২০২২
refayet@yahoo.com

 

COMPILED BY
A.K.M Jamal Uddin

28th Batch, Marine Academy Bangladesh.

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

Recent Posts

[Not a valid template]

Related Articles

শহীদ মিনারের জয় – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

তারপরে এলো সেই চরমক্ষণ। স্টল সাজানীতে বিজয়ী দলের নাম। দ্বিতীয় হলো ভারত;...

গরম তেলের ঝলসানি – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

অন্যান্য সবদিনের মতই, সেদিনও ইঞ্জিনরুমে কাজ করছি। হঠাৎ উপরে ছাদের দিকের একটা...

পানামা ক্যানাল – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

এখানে মানুষের বদলে জাহাজ; আর শুকনা ফুটপাথের বদলে দুই মহাসাগর; ওভারবীজটা হলো...

কষ্টের বাগান – সুখের বাগান: রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই) 

আমি নিজহাতে পুরুষফুল নিয়ে ডাইরেক্ট গিয়ে মিসেস ফুলের উপরে লাগিয়ে লাগিয়ে রেণু...