Home Articles টাইটানিকের উপহার – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)
ArticlesRefayet Amin

টাইটানিকের উপহার – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

জাহাজের জীবন এমনিতেই ভীষণ কঠিন – প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আছেই, সেই সঙ্গে ইঞ্জিনজনিত কারণ, বা মানুষের ভুলের কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। তবে, একটা জাহাজ হুট করে একমুহূর্তে ডুবে যায় না – অনেক দীর্ঘ সময় লাগে। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি যাতে, জাহাজটা বাঁচানো যায়; আর কোনকিছুতেই কাজ না হলে তখন বাধ্য হই। একমাত্র ক্যাপ্টেনই মৌখিক অর্ডার দিতে পারবেন Abandon Ship করতে।

 

টাইটানিক তো সেই ১৯১২ সালেই ডুবে গিয়েছিলো, সেটা আবার কী উপহার দিবে? আসলে প্রতিটা দুর্ঘটনা, প্রতিটা আগুন, প্রতিটা ব্যর্থতা-বিফলতাই এক একটা শিক্ষা হতে পারে; হতে পারে উদাহরণ যার ফলে ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা বা বিফলতা এড়ানো যায়। টাইটানিক কেনো ডুবেছিলো, সেটার উত্তর সবাই জানে – আইসবার্গ, ক্যাপ্টেনের উদ্ধত গোয়ার্তুমি, একগুঁয়েমি, অপরিণামদর্শিতা, সময়মত সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া, ইত্যাদি। সেগুলোর সবগুলো থেকেই অনেক শিক্ষা পাওয়া যায়, কিন্তু আমার বিষয় সেটা না। সেদিন সেখানে কতজন মানুষ মারা গিয়েছিলো – সেটা কল্পনা করেছেন? ৩,৩০০ জন নিয়ে রওনা দিয়েছিলো, ১৫০০ জনেরও বেশী মারা গিয়েছিলো। এত বিলাসবহুল টাইটানিকে যত প্যাসেঞ্জার ছিলো, তাদের সকলের জন্য পর্যাপ্ত লাইফবোট ছিলো না। থাকলে হয়তো আরো অনেকেই বেঁচে যেতো। ১৯১২ সালে এতশত নিয়মকানুন ছিলো না, আর যাওবা ছিলো – খুবই শিথিল। কিন্তু টাইটানিক ডুবার পরিণতিতে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা (IMO – International Maritime Organization) ১৯১৪ সালে SOLAS (Safety of Life At Sea) কনভেনশান করে, যার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো, আমাদের মত নাবিকদের জীবনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।

জাহাজী-ভাষায় লাইফবোট-ক্যাপাসিটি, যার মানে হলো জাহাজটার লাইফবোটে কয়জন মানুষের জায়গা হবে। ঠিক সমসংখ্যক মানুষই জাহাজটায় চড়তে পারবে – কার্গো বা প্যাসেঞ্জার জাহাজই হোক, যখন সেই জাহাজ সমুদ্রে যাবে, লাইফবোট ক্যাপাসিটির বেশী একজনও জাহাজে থাকতে পারবে না। এটাই হলো সেই উপহার, যা টাইটানিক ডুবে গিয়ে আমাদেরকে দিয়েছে। আমরা মেরিনাররা প্রায়শই একটা প্রশ্নের মুখামুখি হই – জাহাজে ফ্যামিলি নিতে পারেন? উত্তরে দুইটা অংশ থাকে – প্রথমতঃ যেই কোম্পানীর জাহাজ, তাদের পলিসি কী? আর দ্বিতীয়তঃ, জাহাজের লাইফবোট-ক্যাপাসিটি আছে কিনা? অনেক কোম্পানীই ইন্সুরেন্স এবং লায়াবেলিটি, দায়ভার এড়ানোর জন্যে পরিবারসহ সেইলিং করতে দেয় না। আবার অনেক কোম্পানী, লাইফবোট-ক্যাপাসিটি থাকলে, পরিবার নিতে অনুমতি দেয় – স্ত্রী-সন্তান সকলেই।

বাংলাদেশে শিপ-ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রির বদৌলতে এখন আমরা সকলেই কমলা রঙের লাইফবোটের সঙ্গে বেশ ভালোই পরিচিত। প্রতিটা কার্গো জাহাজের দুইপাশে দুইটা লাইফবোট থাকে; আর প্যাসেঞ্জার শিপে থাকে, সর্বমোট প্যাসেঞ্জার+নাবিকদের সংখ্যার চাইতে বেশী। দুইপাশে লাইফবোট রাখার কারণ হলো, জাহাজ যদি অস্বাভাবিকভাবে কাত হয়ে যায়, তাহলে একদিকের লাইফবোটটা পানিতে নামানো যাবে না। অন্যদিকেরটা তখন ব্যবহার করতে হবে। মডার্ন জাহাজে, বিশেষ করে তেল-কেমিক্যালের ট্যাঙ্কারে পিছনের দিকে শুধুমাত্র একটাই স্লাইডিং বা ফ্রীফল (Freefall) লাইফবোট থাকে। বিশ-তিরিশ বছর আগে আমি যখন সমুদ্রে ছিলাম, তখনকার লাইফবোটগুলো সাধারণ নৌকার মত ছাদবিহীন ছিলো। অল্প কয়েকটাই ছিলো সম্পূর্ণ ঢাকা। বর্তমানে অধিকাংশই সম্পূর্ণ এনক্লোজ্‌ড্‌, TEMPSC (Totally Enclosed Motor Propelled Survival Craft)। এই এনক্লোজ্‌ড্‌ লাইফবোটগুলো খুবই উপযুক্ত – প্রথমতঃ খোলা সমুদ্রে সূর্যের তাপ বা বৃষ্টি-বরফ-শীত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এগুলো ডুবে না এবং উল্টে গেলে নিজের থেকেই সিধা হয়ে যায়। এনক্লোজ্‌ড্‌ বলে অনেক ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতিও রাখা সম্ভব, যার ফলে লাইফবোট চালানোও যাবে এবং উদ্ধার কাজেও সহায়তা করবে।

নীল দরিয়া কিন্তু শুধুই নীল নয়। সেটা যে কত ভিন্ন ভিন্ন রঙ ধারন করতে পারে, তা আমরা যারা গভীর সমুদ্রে গিয়েছি তারাই দেখেছি। ঘন কালো কৃষ্ণবর্ণ থেকে শুরু করে, পান্নার মত এমারেল্ড সবুজ, আকাশের নীলের প্রতিচ্ছবিতে হাল্কা নীল থেকে শুরু করে মেরিন ব্লু – কত রঙ যে হয় ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সেইজন্য, প্লেন-হেলিকপ্টার বা অন্য বোটের উদ্ধারকারীরা অথৈ সমুদ্রের ঘনকালো বা ঘননীল পানির মাঝে বিন্দুর মত লাইফর‍্যাফট, লাইফবোট, লাইফজ্যাকেট ইত্যাদিকে সহজে খুঁজে পাওয়ার জন্য সেগুলোর রঙ সবসময়ই হয় উজ্জ্বল রঙের (লাল, কমলা বা হলুদ)। সেই সঙ্গে থাকে রিফ্লেক্টিভ স্ট্রিপ, যেগুলোতে আলো পড়লে জ্বলজ্বল করবে।

জাহাজে থাকতে, সবসময়ই মনে মনে দোওয়া করতাম – কোনোদিন যেন, সত্যি সত্যি ইমার্জেন্সীর কারণে লাইফবোট নামাতে না হয়। লাইফবোটে তো আর এমনি মজা করে হাওয়া খেতে বের হবো না – সেটা যদি সত্যি সত্যিই ব্যবহার করা হয়, তার মানে জাহাজে ভীষণ বিপদ হয়েছে। বড়সড় আগুন লেগেছে অথবা জাহাজ ডুবছে – মোটকথা এমনই বিপদ যে, সব্বাইকে প্রাণের ভয়ে জাহাজ ছাড়তে হয়েছে। জাহাজের জীবন এমনিতেই ভীষণ কঠিন – প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আছেই, সেই সঙ্গে ইঞ্জিনজনিত কারণ, বা মানুষের ভুলের কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। তবে, একটা জাহাজ হুট করে একমুহূর্তে ডুবে যায় না – অনেক দীর্ঘ সময় লাগে। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি যাতে, জাহাজটা বাঁচানো যায়; আর কোনকিছুতেই কাজ না হলে তখন বাধ্য হই। একমাত্র ক্যাপ্টেনই মৌখিক অর্ডার দিতে পারবেন Abandon Ship করতে।

An explanatory infographic (PC: safety4sea)

লাইফবোটে ইঞ্জিন থাকে, যেটার স্পীড এমন হতে হবে যে, যাতে করে দ্রুত জাহাজ থেকে সরে যেতে পারে। মনে রাখবেন জাহাজের মত এত বড় একটা জিনিস ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে পানির মধ্যে ভীষণ একটা ঘূর্ণির সৃষ্টি করে আশেপাশের সবকিছুকে প্রবলটানে আকর্ষণ করে একসাথে নিয়েই ডুবে। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখান থেকে সরে যেতে হবে। আর আগুন লাগলেও কাছে থাকার কোন মানেই হয়না, আগুনের হল্কা এসে পুড়িয়ে দিবে। সেইজন্য লাইফবোটের ইঞ্জিন অনেক জরুরী একটা জিনিস, সবসময়ই এর দেখভাল করে রাখতে হয়। পর্যাপ্ত তেলপানি আছে কিনা, ইঞ্জিন ঠিকমত স্টার্ট নেয় কিনা এবং চলে কিনা – এগুলো সবই চেক করা হয় নিয়মিত। কিছুদিন পরপরই লাইফবোট-ড্রিল – আসল বিপদের সময়ে কীভাবে কি করতে হবে সেগুলোর প্র্যাক্টিস করি। প্রায়ই পানিতে নামিয়েও চালানো হয়।

SOLAS-এর লিস্ট ধরে প্রয়োজনীয় যা কিছু ইমার্জেন্সিতে লাগতে পারে তার সাপ্লাই লাইফবোটে থাকে – বৈঠা, বোটহুক, কম্পাস, খাওয়ার-পানি, শুকনা টিনের খাওয়ার (প্রটিন-বিস্কিট), ফার্স্ট-এইড বক্স, লাল/কমলা রঙের স্মোক-ফ্লেয়ার, প্যারাস্যুট-ফ্লেয়ার, পাইরোটেকনিক – ফায়ারওয়ার্ক্সের মতই আতসবাজি, টর্চ-লাইট, হুইস্যল, আয়না (মুখ দেখার জন্যে আয়না নয়, বরং সূর্যের আলো দিয়ে সিগ্ন্যাল দেওয়ার জন্যে)। এগুলো দিয়ে উদ্ধারকারী জাহাজ বা প্লেন বা হেলিকপ্টারের দৃষ্টি আকর্ষন করা যাবে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানানোর জন্যে থাকে EPIRB (Emergency Position Indicating Radio Beacon)। সব সাপ্লাইগুলো ঠিক আছে কিনা, মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে কিনা সেগুলো সব সময়েই চেক করে রেকর্ড রাখা হয়। পানি ও খাওয়ার সাপ্লাই কয়েকদিনের জন্যে থাকে। আর থাকে মাছ-ধরার যন্ত্রপাতি, বৃষ্টির পানি ধরার ব্যবস্থা, পানি সেচ করার সিস্টেম ইত্যাদি প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই থাকে।

লাইফবোট থাকে জাহাজের উপরের দিকে, কেবিনগুলোর পাশে, সমুদ্রের পানি থেকে প্রায় দশ-বারোতলারও বেশী উঁচুতে। শক্ত করে বাঁধা থাকে, যাতে ঝড়ঝাপটা, সমুদ্রের দুলুনীতে সেটা না নড়ে। এর সঙ্গে একটা ক্রেন (ডেভিট) থাকে যেটার সাহায্যে পানিতে নামানো হয়; আর স্লাইডিং হলে তো বাঁধন খুলে দিলে শাঁ করে পানিতে পড়বে। ডেভিট দিয়ে নামানোর জন্যে একটা হ্যান্ডেল ধরে থাকতে হয় এবং খুব স্লো-স্পীডে নামে। মানুষসহ হঠাৎ করে ছেড়ে দিলে, ভীষণ জোরে পানিতে পড়ে আরেকটা এক্সিডেন্ট ঘটাবে; মানুষ মারাও যেতে পারে। এই হ্যান্ডেলটাকে বলে Deadman’s Handle; এটাও সেইফটিরই অংশ। এই হ্যান্ডেল তুলে ধরে রাখলে, ধীরে ধীরে লাইফবোট নামবে। কিন্তু, এই হ্যান্ডেল ছেড়ে দিলে সেটা ব্রেক হিসাবে কাজ করে লাইফবোট নামা বন্ধ করে দিবে। ধরে নেওয়া হয় যে, সেই মানুষটা মারা গেছে বলেই তার হাত থেকে হ্যান্ডেলটা পড়ে গেছে; তাই এই নাম। পানিতে নামানোর পরে জাহাজ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে রিলিজ-হুক আর পেইন্টার (দড়ি) খুলে ফেলে দ্রুত সরে যেতে হবে। আর মনে মনে টাইটানিকের মৃতযাত্রীদের ধন্যবাদ জানাতে ভুলবেন না।


টলিডো, ওহাইও, ২০২২
refayet@yahoo.com

 

COMPILED BY
AKM Jamal Uddin

28th Batch, Marine Academy Bangladesh.

Categories

Recent Posts

Gallery

img_2416 IMG_0164 IMG_0606 IMG_6373 BMCS Community Night - 3rd Nov 2018-82 IMG_0168

Related Articles

Merchant Ship Breaking – Mubashir Ahmed Khan (2E)

In addition to English, I write in Urdu also. Recently my article...

এক সমুদ্রচারীর সা‌থে চার দশক

সমুদ্রের বিচিত্র রূপ ও সমুদ্রচারীদের জীবন নিয়ে লেখা; বইটি পাওয়া যাবে একুশে...

Chowdhury Sadaruddin (19E): A Distinguished Bangladeshi-Australian Maritime Leader and Community Champion

Chowdhury Sadaruddin is a distinguished Bangladeshi marine engineer and a proud graduate...

শহীদ মিনারের জয় – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

তারপরে এলো সেই চরমক্ষণ। স্টল সাজানীতে বিজয়ী দলের নাম। দ্বিতীয় হলো ভারত;...