Home Articles সিএনজি থেকে বেবীঃ ১৯ নভেম্বর, ২০২১ – মাহমুদ- ২১ ন
Articles

সিএনজি থেকে বেবীঃ ১৯ নভেম্বর, ২০২১ – মাহমুদ- ২১ ন

এ শতকের প্রথমদিক পর্যন্ত ঢাকা শহরের উচ্চ মধ্যবিত্তের যানবাহন ছিল হলুদ রঙের বেবী ট্যাক্সি। গাড়ি তখনও তাদের জন্য ডাল ভাত হয়ে যায় নি। মধ্যবিত্তরা পরিবার পরিজন নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেলে বেবী ট্যাক্সি চরত। পৃথিবীর সমস্ত শহরেই ভাড়ায় চালিত গাড়িকে ট্যাক্সি বলা হয়। বাংলাদেশ মনে পৃথিবীতে একমাত্র দেশ যেখানে ট্যাক্সি নামে কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। যদি দূরে কোথাও যেতে হতো, তাহলে রেন্ট-এ-কার নামক কোম্পানি থেকে প্রাইভেট কার কিংবা মাইক্রো বাস ভাড়া করা যেত। উবার তখন সাইন্স ফিকশন। ভারত থেকে আসা তিন চাকার ভেসপা কিংবা বাজাজ অটোরিকশা ভাড়ায় চলতো, তাই সিডান গাড়ির বাচ্চা সাইজের বস্তুটি “ব্যাবী ট্যাক্সি” নামে পরিচিত ছিল। এখন আধুনিক প্রজন্ম যেমন গার্ল-ফ্রেন্ড কে আদর করে ব্যাবী বলে, আমরাও তখন অটো রিক্সা কে ব্যাবী-ট্যাক্সি বলতাম না, আদর করে ডাকতাম, এই ব্যাবী। ২০০২ সালে আমাদের আদরের হলুদ ব্যাবীকে ঢাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হল, নিয়ে আসা হল সবুজ রঙের অটোরিকশা। নূতন লাউ যদিও দেখতে কদুর মতোই, কিন্তু স্বাদে তফাৎ ছিল। ব্যাবী ছিল টু-স্ট্রোক ইঞ্জিন চালিত আর নতুন লাউ চার-স্ট্রোক ইঞ্জিন চালিত। আবার এর সাথে বোনাস হল, নূতন অটোরিকশা তেলের সাথে সাথে সিএনজি দিয়েও চালানো সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল আদুরে ডাক নিয়ে। এই ‘চার স্ট্রোক ব্যাবী’, এভাবে ডাকলে দেখা যাবে ড্রাইভার স্ট্রোক করছে। সবুজ ব্যাবী ডাকারও কোন মানে নেই, কারণ তখন আর অন্য কোন রঙের ব্যাবী নেই। আগের মত শুধু ব্যাবী ডাকলে কি সমস্যা হতো আমার জানা নেই, খুব সম্ভবত পুরনো প্রেমিকার প্রতি লয়ালিটির কারণেই নবাগত তরুণীকে কখনোই আর আগের নামে ডাকা হল না, নূতন নামকরণ করা হল ‘সিএনজি’। চিটাগাং এবং ঢাকারও অনেক জায়গায় অটোরিকশা পেট্রলে চলতো, তারপরেও তাকে ডাকা হতো সিনএনজি। ব্যাবী ট্যাক্সির প্রতি আমাদের অনন্ত প্রেম সত্যি স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো, এর পরেও অনেক গার্ল ফ্রেন্ড এসেছে, কিন্তু কাউকে আর ব্যাবী ডাকিনী।
জানি অনেকেই হয়ত ভাবছে জাহাজে বসে ব্যাবী ট্যাক্সি নিয়ে এত স্মৃতিচারণের কারণ কি? উনি কি আগে ব্যাবীট্যাক্সি চালক ছিলেন? আসলে এত বড় শানে নুযূল দেবার কারণ হল পরিবেশ, বায়ু দূষণ। টু স্ট্রোক ব্যাবীট্যাক্সি থেকে টক্সিক গ্যাস নিঃসরণ অনেক বেশী হতো, চার স্ট্রোকে অনেক কম। সে সময় ঢাকা শহরের রাস্তায় শীতের কুয়াশার মত এক স্তর সাদা ধুয়া ভেসে থাকত। সিএনজি চালিত অটো আসার পর তার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। প্লাস্টিক এবং ব্যাবী বন্ধ করা তৎকালীন সরকারের খুবই ভালো একটি পদক্ষেপ ছিল, আমার মনে হয় না স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে পরিবেশ সম্পর্কিত এর চেয়ে বড় কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে এটাকে কোন উন্নয়ন বলা না গেলেও, যদি হিসেব করা হয়, কোটি লোকের শহরে কত লাখ লোক বিষাক্ত ধোয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং তাতে কত টাকার চিকিৎসা খরচ বেচেছে, তাহলে অন্য যে কোন অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়ে এটা কোন অংশে কম ছিল না। এখন প্রশ্ন জাগবে, সেই হলুদ ট্যাক্সি গুলোর কি হল? তাদের কি গুড়িয়ে ফেলা হল? তা নয়, তাদের ঢাকা শহর থেকে বের করে দেয়া হল, তারা চলে গেল মফঃস্বলে, এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভট ভট করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের বুড়ো ব্যাবী হিসেবে বেচে ছিল।
জাহাজের ক্ষেত্রেও এমন কিছু নূতন আইনকানুন এসেছে, যদিও আমাদের দেশে নয়, বহির্বিশ্বে। জাহাজ চালানোর জন্য অনেক বড় ক্ষমতা বা হর্সপাওয়ারের ডিজেল ইঞ্জিন ব্যাবহার করা হয়। একটি প্রচলিত ভুল ধারনা রয়েছে যে পেট্রল বা গ্যাসোলিনে চললে তাকে পেট্রল ইঞ্জিন বলা হয়, আর যে ইঞ্জিন ডিজেলে চলে তাকে ডিজেল ইঞ্জিন বলা হয়। আসলে ডিজেলে চলার জন্য ডিজেল ইঞ্জিন বলা হয় না, রুডলফ ডিজেল নামে একজন জার্মান ইঞ্জিনিয়ার এ ধরনের ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিলেন বলে তার নামে নামকরণ হয় “ডিজেল ইঞ্জিন”। এসব ইঞ্জিনে কোন স্পার্ক-প্লাগ থাকে না, অতিরিক্ত চাপের মাধ্যমে ইগনিশন ঘটানো হয়, বা আগুন জ্বালানো হয়। জমিদার বংশের লোকজন যেমন দুধে আলতা গাঁয়ের রং, ননীর পুতুল, কিন্তু অকর্মা, তেমনি তেলের ক্ষেত্রেও যত পরিষ্কার, ততোই অকর্মা। পেট্রোল দেখতে একদম পানির মত, কিন্তু তার শক্তি কম। সহজ ভাবে বুঝাতে গেলে একটি পেট্রোল জেনারেটর খুব হালকা, শহুরে ভদ্র লোকের মত খুব আস্তে আস্তে কথা বলে, শব্দ কম, কিন্তু তার শক্তিও কম। ১০ লিটার পেট্রোলে যত বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, ১০ লিটার ডিজেলে তার চেয়ে বেশী উৎপাদন হবে। জাহাজ বা বড় পাওয়ার প্লান্টে এজন্য ভারি তেল বা বলা চলে ডার্টি অয়েল ব্যাবহার করা হয়। বেশ কিছুদিন আগে একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়, “দামে কম মানে ভালো কাকলি ফার্নিচার”। ব্যাপারটি এমনিতে হাস্যকর হলেও জ্বালানী তেলের ক্ষেত্রে এটাই সত্যি। দামে কম ডিজেল কামে ভালো হয়। তাই জাহাজ চালানোর জন্য বাজারে প্রচলিত ডিজেলের চেয়েও দামে কম মানে ভালো, আরও ডার্টি এবং ভারী হেভি ওয়েল ব্যাবহার করা হয়। তবে এর খারাপ দিক হল, পরিবেশ বেশী দূষণ করে। ফলে উন্নত দেশ গুলি নানাবিধ বিধি নিষেধ আরোপ করা শুরু করেছে। এমেরিকা, ইউরোপ, চীনের মত অনেক দেশই ধীরে ধীরে তাদের এলাকায় হেভি ওয়েল ব্যাবহার নিষিদ্ধ করা শুরু করেছে। এসব দেশ গুলোর চারদিকে তারা দাগ টেনে দিয়েছে, মানে ম্যাপে একটি সীমানা রেখা দিয়ে দিয়েছে, এর ভেতরে ঢুকলেই হেভি ওয়েল আর ব্যাবহার করা যাবেনা, লো-সালফার ডিজেল ব্যাবহার করতে হবে। একে বলা হয় ECA জোন। এমিশন কন্ট্রোল এরিয়া। আজ ভোর চারটা বাজে আমরা এমিশন কন্ট্রোল এলাকা থেকে বেড়িয়ে এসেছি, মানে সিএনজি থেকে ব্যাবী ট্যাক্সিতে রূপান্তরিত হয়েছি। ইঞ্জিনিয়াররা ভোর বেলায়ই ঘুম থেকে উঠে জ্বালানী তেল পালটে দিয়েছে, মানে দামী ডিজেলের পরিবর্তে কাকলি ফার্নিচার ব্যাবহার শুরু হয়েছে। এরকম কাজকর্মে নানাবিধ জটিলতা দেখা দিতে পারে, সুতরাং ক্যাপ্টেনকে জানানো হয় যে আমরা এটা শুরু করেছি, আর আমাকেও ব্রিজে একবার চেহারা দেখিয়ে আসতে হয়, অনেকটা এমন যে “ভাই কোন চিন্তা কইরো না, আমি থাকতে তোমাদের কোন ভরসা নাই”
আমি জাহাজের সবচেয়ে আকামের গোঁসাই, যাকে দিয়ে কোন কাজই হয় না। কেউ যখন কোন কাজ পারেনা বা করেনা, উল্টা এসে বলে এভাবে করো, ওভাবে করো, তখন মানুষ বলে, “ওই মিয়া কাপ্তানি কইরো না”। এজন্যই সব কাজে আমাকে ডাকা হয়, মানে কাম করবা না ঠিক আছে, কিন্তু নাক ডাইকা ঘুমাইবা, তা হতে দিমু না। ভোরে উঠার পর আর ঘুমাই নি। ব্রিজে সবাই নেসক্যাফে খায়, যা আমার পছন্দ না। একটা ড্রিপ কফি মেশিন ছিল, আমি গত ভয়েজে সাইন-অফ করার পর কেউ সেটা বাক্স বন্দী করে দিয়েছিল। সেকেন্ড মেট সেটা আবার খুঁজে বের করেছে, সুতরাং সকাল বেলা সেটা উদ্বোধন করা হল। পঞ্চম দিনের মত টানা ব্রেকফাস্ট মিস করা হল না। চীফ অফিসারকে নিয়ে বসলাম নানাবিধ কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে। সে ও মাত্র মাস খানেক আগে যোগ দিয়েছে, জাহাজের অনেক কিছুই আমার কাছ থেকে জেনে নিচ্ছে। যদিও ভেটিং এবং কোস্ট গার্ড ইন্সপেকশনের পর কর্মচাঞ্চল্য কিছুটা কম, তবুও আমি নূতন যোগ দিয়েছি, তাই একটু নাড়াচাড়া দেয়া হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে আধুনিকায়ন হচ্ছে। আগে মানুষ অফিসে গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিত, এখন এক্সেস কন্ট্রোল ডিভাইসে আইডি কার্ড রাখলেই রেকর্ড হয়ে যায় যে কে এসেছে। আগে অফিসে না গিয়েও পরদিন গিয়ে দুদিনের সিগনেচার করলে তার উপস্থিতি রেকর্ড হয়ে যেত, এক্সেস কার্ডের কারণে তার সুযোগ আর নেই। জাহাজে আমরা চার ছয় মাসের জন্য এক্সেস করি, তাই হাজিরা খাতার প্রয়োজন নেই। তবে জাহাজের এমন কিছু ব্যাপার রয়েছে তা হাজিরা খাতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ফায়ার-সেফটি রাউন্ড। রাতের ব্রিজ ডিউটি অফিসার এবং ক্রু চার ঘণ্টা ওয়াচ শেষ করার পর একোমোডেশনের প্রত্যেক ফ্লোরে গিয়ে রাউন্ড দেবে, নিশ্চিত করবে সব কিছু ঠিক ঠাক আছে। কোন কিছু গড়াগড়ি খাচ্ছে না, দরজা লক করে রাখা, স্মোক রুমে কেউ আধা জ্বলা সিগারেট ফেলে যায় নি, লণ্ড্রী রুমে কেউ ইস্ত্রি অন করে চলে যায় নি, এমন অসংখ্য জিনিষ দেখার মত রয়েছে। সমস্যা হল যাদের রাউন্ড নেবার কথা তারা আদৌ রাউন্ড নিয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করার উপায় নেই। ব্রিজ থেকে নেমে সোজা ক্যাবিনে গিয়ে ১০ মিনিট পর ফোন করে ব্রিজে জানিয়ে দিল রাউন্ড নিয়েছি এবং সব কিছু ফাস-কেলাস। এটা একটি উদাহরণ মাত্র, জাহাজে প্রতিদিন অনেক কিছু আমাদের চেক করতে হয়ে, এসব চেক যদি ইমানদারের মত করা হয়, জাহাজ নিরাপদ। অন্যথা এসব ক্ষেত্রে গাফলতির কারণেই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, দুর্ঘটনা ঘটে। আমাদের কোম্পানি তাই নূতন প্রযুক্তি ব্যাবহার শুরু করছে। জাহাজে প্রায় ৬০-৭০ টি সেন্সর বা বিকন লাগানো হবে, যা ওয়াইফাই এর মাধ্যমে সংযুক্ত থাকবে। মোবাইল ফোন বা স্মার্ট ওয়াচের মত ডিভাইস পরে কেউ বিকনের আসে পাশে গেলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে রেকর্ড হয়ে যাবে, অতটার সময় অমুকে এসেছিল। ক্যাবিনে বসে চাপা মারার যুগ প্রায় শেষ হয়ে আসছে। মাস খানেক আগে কোরিয়াতে টেকনিশিয়ান এসে ওয়াইফাই রাউটার লাগিয়ে দিয়ে গেছে। ৭০ টা বিকন লাগানো এবং এসব কনফিগার করা বাকি, সেসব করার দায়িত্ব জাহাজের উপর দিয়ে গেছে, যা এখনও হয় নি। সুতরাং আজকে থেকে সেটা নিয়ে ব্যস্ত। যদিও ক্যাপ্টেন জাহাজের একমাত্র আমড়া কাঠের ঢেঁকি, তারপরেও তাকে ভাব নিতে হয় সে পিউর বার্মা টিক। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে সকাল থেকে এটা নিয়ে ব্যস্ত, কারণ অফিস কে বলেছি, আমি দুদিনের মধ্যে শেষ করে দেব, মানে আমি করবো না, করায়ে দেব। বেশী ভাব দেখাতে গিয়ে সমস্যা পরেছি, কাজটা করতেই হবে। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অসম্ভব কর্মঠ একজন ব্যক্তি। সকালে ওকে ব্রিজে ডেকে এনে কনফিগার করা শুরু করেছি এমন কিছু যা জীবনে চোখে দেখা তো দুরের কথা, নামও শুনিনি। ম্যানুয়াল পড়ে পড়ে কাজ করার চেষ্টা করছি, যে ভাবে আধুনিকা নারীরা ইউটিউব দেখে কুকিং করে। দুচারটা হয়ে যাবার পর ইল-ইঞ্জ কে বললাম আমি একজন সেকেন্ড অফিসার দিচ্ছি, ওকে নিয়ে বাকিটা শেষ করে ফেল। সে বলল দরকার হবে না, আমি করে ফেলব। পাঁচটা বাজে ছুটি হয়ে গেলেও সে সন্ধ্যার পরেও এটার পেছনে লেগে রইল, এবং রাত ন’টায় এসে জানাল যে সব শেষ। আমি দ্রুত অফিসে ইমেইল করে জানিয়ে দিলাম যে কর্ম সম্পাদিত। যা এতদিনে কেউ করতে পারেনি, আমি এসে একদিনে করে দিলাম, আমি একজন বিরাট কুতুব। আসলে আমাদের মেইলে কারো নাম স্পেসিফিক্যালি উল্লেখ করার নিয়ম নেই, না হলে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের নাম উল্লেখ করে লিখতাম যে ‘He is an asset’ ।
আমরা হাওয়াই থেকে পূর্ব দিকে যাচ্ছি, সাথে সাথে সামান্য দক্ষিণে নেমে যাচ্ছি। যতই পূর্ব দিকে যাওয়া হয়, ঘড়ি ততই এগিয়ে যায়। সুতরাং কয়েকদিন পর পর ঘড়ি এগিয়ে দিয়ে হয়। এ কাজটা করে সেকেন্ড অফিসার, যে ১২টা-৪টা ন্যাভিগ্যাশন করে। বিকেলেই ওকে বলে দিয়েছিলাম ক্লক-এডভান্স করার জন্য, সন্ধ্যায় সে পাবলিক এড্রেস সিস্টেমে এনাউন্স করে দিয়েছে যে মধ্যে রাতে ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে দেয়া হবে। আগের দিনে সেকেন্ড অফিসার নিজে গিয়ে গিয়ে সমস্ত পাবলিক প্লেসের ঘড়ির কাটা ঘুরিয়ে দিত। সে যুগ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। বহু বছর থেকেই জাহাজের ব্রিজে মাস্টার ক্লক থাকে, সেকেন্ড অফিসার রাত বারটায় এসে সেটা এক ঘণ্টা আগে বা পিছে করে দিলে জাহাজের সমস্ত ঘড়ি স্বয়ংক্রিয় ভাবে তাল মিলায়। ঘড়ি এগিয়ে গেলে সেদিন আর চব্বিশ ঘণ্টার থাকেনা, ২৩ ঘণ্টার দিন হয়ে যায়। সেকেন্ড অফিসার ডিউটি করবে ১২-৪টা, সে বারটা বাজে ডিউটিতে গেল, আর ঘড়ি এগিয়ে দিল, একটা বেজে গেল, অতএব তার ডিউটি চার ঘণ্টার বদলে তিন ঘণ্টা হয়ে গেল, এটা অন্যদের প্রতি বেইনসাফি হবে। অতএব একঘণ্টা সময় সমান ভাবে সবাইকে বণ্টন করা হয়। তিন অফিসার ২০ মিনিট করে কম ডিউটি করবে। সেকেন্ড অফিসার বারটার পরিবর্তে রাত ১১:৪০ এ ডিউটিতে যাবে, তার মানে যে থার্ড অফিসার ৮ টা বাজে ডিউটিতে এসেছে, তার ডিউটি হবে ৩ ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট। সেকেন্ড অফিসার ডিউটিতে ১১:৪০ এ গেলেও সে গিয়েই ঘড়ি এগিয়ে দেবে, মানে তখন আসলে বাজবে ১২:৪০। সে ডিউটি করবে নূতন সময় ০৪:২০ পর্যন্ত, মানে ১২:৪০-০৪:২০=৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। আর যেহেতু পরের ওয়াচ কিপার আসবে, ০৪:২০ মিনিটে, থাকবে সকাল আটটা পর্যন্ত, তার ডিউটি ও হবে ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট, এভাবেই সময়কে সম বন্টন করা হয়।
আমাদের জনসংখ্যা ফিক্সড, একজন কম কাজ করলে আরেকজনকে বেশী করতে হবে, বাইরে থেকে কাউকে ভাড়া করে আনা যাবেনা। তাই সময়কে আমরা কঞ্জুষের মত মিনিটে সেকেন্ডে হিসাব করি। সেই প্রাচীন যুগ থেকেই নাবিকদের ডিউটি শিফট হিসেবে হয়, শিপ নেভার স্লীপ, কখনোই ঘুমায় না। নদীতে রাতের বেলা নৌকা পাড়ে বেঁধে ঘুমাতে পাড়ে, কিন্তু সাগরে এটা সম্ভব না। গভীর সমুদ্রে নোঙর করা যায় না, জাহাজ থামিয়ে দিলে সে বেশী দুলবে, স্রোতের টানে আরেক দিকে চলে যাবে, তাই চলতে থাকাই আমাদের জীবন। সেই পালতোলা জাহাজের যুগেও পালা করে নাবিকরা ন্যাভিগেশন ডিউটি করতো। তার কাজ হল চারদিকে নজর রাখা, দুরবিন দিয়ে তাকিয়ে দেখা, কোন মাটি নজরে আসে কিনা, বা অন্য কোন শিপ, কিংবা জলদস্যুদের জাহাজ। এবনর্মাল কিছু দেখলেই ক্যাপ্টেনকে ডেকে আনা হতো। এজন্য ন্যাভিগেশনে সম্পৃক্ত নাবিকদের বলা হতো ওয়াচকিপার, সে তীক্ষ্ণ নজর রাখে, পাহারা দেয়, ওয়াচ করে। নাবিকদের আরেকটি মূল্যবান সম্পত্তি ছিল ঘড়ি। ঘড়ি ব্যতীত জাহাজের পজিশন বা অবস্থান জানা সম্ভব ছিল না। চাঁদ, সূর্য গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান দেখে অনেক আগে থেকেই মানুষ ল্যাটিচুড বা অক্ষাংশ বের করতে পারত, কিন্তু ঘড়ি আবিষ্কার হবার আগ পর্যন্ত দ্রাঘিমাংশ বা লঙ্গিচুড বের করতে পারতো না। এজন্যই কলম্বাস বাহামা গিয়েই ধারনা করেছিল সে ভারতে চলে এসেছে, ঘড়ি থাকলে তার আর এ ভুল হতো না। বুঝতে পারতো ভারত যেতে তাকে আরও অনেক লঙ্গিচুড অতিক্রম করতে হবে। ঘড়ি আবিষ্কৃত হল সময় পরিমাপের জন্য, কিন্তু নাবিকরা এর ব্যাবহার শুরু করলো নিজের অবস্থান জানার জন্য। নাবিক ওয়াচকিপিং করতো আর ঘড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করতো পরশমণির মতো। তখন একজন ন্যাভিগেটর বা ওয়াচকিপার আর শুধু জাহাজের পাহারাদার বা কীপার রইলো না, সাথে সাথে ঘড়িরও ‘কীপার’ হয়ে গেল। এক ব্যক্তিকে তো আর ওয়াচ-কীপার এবং ক্লক-কীপার, এরকম দু নামে ডাকা যায় না, সুতরাং জাহাজে ক্লক তার নাম পালটে ওয়াচ হয়ে গেল। নাবিকদের কারণেই আমরা আজ রোলেক্স ক্লক বা এপল স্মার্ট ক্লক না বলে ওয়াচ বলি।
যা হোক এবার বাংলায় ফিরে আসি। টাইম ডিফারেন্সের জন্য আমাদের যখন সন্ধ্যা, তখন সিংগাপুরে অফিস শুরু হয়, ইমেইল আসতে শুরু করে। সেসবের উত্তর দিলে আবার ফিরতি উত্তর রাতেই চলে আসে, তাই ঘুমাতে যাবার আগে পৌনে বারটার দিকে শেষবারের মত কিছু মেইল রিপ্লাই করছি, সিদ্ধান্ত বারটায় ঘুমিয়ে পরব। শেষ মেইলটা পাঠিয়ে দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, রাত একটা বাজে। সেকেন্ড অফিসার লিউ কাঁটায় কাঁটায় বারটায় জাহাজের একটা বাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং আজকে আর শুভরাত্রি নয়, শুভ সকাল। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।


Abdullah Al Mahmud(21N); planetbd@gmail.com

COMPILED BY
A.K.M Jamal Uddin

28th Batch, Marine Academy Bangladesh.

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

Recent Posts

[Not a valid template]

Related Articles

এক সমুদ্রচারীর সা‌থে চার দশক

সমুদ্রের বিচিত্র রূপ ও সমুদ্রচারীদের জীবন নিয়ে লেখা; বইটি পাওয়া যাবে একুশে...

Chowdhury Sadaruddin (19E): A Distinguished Bangladeshi-Australian Maritime Leader and Community Champion

Chowdhury Sadaruddin is a distinguished Bangladeshi marine engineer and a proud graduate...

শহীদ মিনারের জয় – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

তারপরে এলো সেই চরমক্ষণ। স্টল সাজানীতে বিজয়ী দলের নাম। দ্বিতীয় হলো ভারত;...

গরম তেলের ঝলসানি – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

অন্যান্য সবদিনের মতই, সেদিনও ইঞ্জিনরুমে কাজ করছি। হঠাৎ উপরে ছাদের দিকের একটা...