Home Articles একজন স্বপ্নবাজ মেরিনারের গল্প: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৭/ই)
Articles

একজন স্বপ্নবাজ মেরিনারের গল্প: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৭/ই)

নাকিলাতে এর আগে কোনো বাংলাদেশি অফিসার ছিলেন না। জহির রায়হান স্যার জয়েন করার এক মাস পরেই কোম্পানি থেকে তার পারফরম্যান্স জানতে চাওয়া হয় চিফ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে। স্যারের পারফরম্যান্স এতটাই ভালো ছিল যে, ইন্ডিয়ান চিফ ইঞ্জিনিয়ার তাকে ‘এক্সেপশনালি ট্যালেন্টেড’ হিসেবে রিপোর্ট করেন।

আমাদের সিনিয়র ব্যাচের একজন ছিলেন যিনি একাডেমিতে থাকাবস্থায় স্বনামধন্য K-Line কোম্পানির স্কলারশিপ পরীক্ষা দিতে রিফিউজ করেছিলেন! একাডেমির ইতিহাসে এমন নজীর আছে কিনা আমার জানা নেই।
বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিতে আমাদের সময় ডেক আর ইঞ্জিন ডিপার্টমেন্ট থেকে ৫+৫ করে মোট ১০ জনকে স্কলারশিপ দেয়া হতো। দুই ডিপার্টমেন্টের প্রথম ১৫ জন করে নিয়ে মোট ৩০ জনকে ফাইনাল ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হতো। স্যারদের সিলেকশনের দিন সকালে কোম্পানির ডেলিগেট ৩০ জনকে ব্রিফিং দেবার পর কারো কোন প্রশ্ন আছে কিনা জিজ্ঞেস করেন। বরিশাল ক্যাডেট কলেজের ‘কলেজ প্রিফেক্ট’ সেই স্যার জিজ্ঞেস করেন, যেহেতু K-Line কোম্পানির কন্টেইনার ছাড়াও অয়েল/কেমিক্যাল, গ্যাস ট্যাংকার আছে, তো পরবর্তীতে K-Line এর ট্যাংকার ফ্লিটে যাবার সুযোগ আছে কিনা। ডেলিগেট উত্তর দেন, একাডেমি থেকে যাদের বাছাই করা হবে তারা শুধুমাত্র কন্টেইনার জাহাজের জন্য, ট্যাংকার ফ্লিটে যাবার সুযোগ নেই। স্যার বলেন, তাহলে উনি ইন্টারভিউতে বসবেন না যেহেতু উনার ইচ্ছা ট্যাংকারে জব করার। এটা শুনে একাডেমির কমান্ড্যান্ট স্যার থেকে সবাই অবাক! স্যারের রেজাল্ট ভালো থাকায় স্কলারশিপ পাবার সম্ভাবনাও অনেক বেশি ছিল। তখন অনেকেই বলেন, এত বড় একটা সুযোগ হাতছাড়া করা বোকামি, K-Line এর মতো কোম্পানিতে জয়েন করা মেরিনারদের কাছে স্বপ্নের মতো। কিন্তু তিনি তার ট্যাংকারে জয়েন করার ইচ্ছায় অবিচল থাকেন এবং কোন স্কলারশিপ না নিয়েই একাডেমি থেকে বের হন। স্যার অবশ্য একাডেমিতে ‘চিফ রেগুলেটিং ক্যাডেট’ ছিলেন এবং তাদের ব্যাচের ‘বেস্ট ক্যাডেট’ নির্বাচিত হয়ে পুরস্কার পান পাসিং আউটের সময়। উনি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে ফোর্থ হয়েছিলেন চূড়ান্ত মেধাতালিকা অনুযায়ী।

স্যার K-Line পরীক্ষায় অংশ নেননি শুনে তাদের ব্যাচের প্রায় সবাই ধরেই নিয়েছিল যে, জহির নিশ্চিত ‘জ্যাকপার্টি’। তা না হলে, একাডেমির যে স্কলারশিপের জন্য শতশত ক্যাডেট স্বপ্ন দেখে সেটা কিভাবে রিফিউজ করে! কিন্তু সত্যিকার অর্থে স্যারের একটা ‘স্বপ্ন’ ছাড়া আর কিছুই ছিলনা।

পাসিং আউটের ৬ মাস পর স্যার কোন ট্যাংকারে সুযোগ না পেয়ে বাংলাদেশি কোম্পানি ট্রান্সওশান শিপম্যানেজমেন্টের একটা বাল্ক ক্যারিয়ারে জয়েন করেন ইঞ্জিন ক্যাডেট হিসেবে। তখন স্যারের একাডেমিক স্কলারশিপ রিফিউজ করার জন্য আফসোস হয়েছিল কিনা জানিনা। যা হোক, মিশর এঙ্করেজে থাকাবস্থায় স্যার একদিন একটা গ্যাস ট্যাংকার দেখেন এবং সাথে থাকা ফিটার সাহেবের কাছে জানতে চান ওটা কিসের জাহাজ। ফিটার সাহেব জানায় ওটা একটা গ্যাস ট্যাংকার আর সেখানে সব ইউরোপীয়ানরা জব করে। বাংলাদেশি অফিসাররা সেসব জাহাজে নাই বললেই চলে। সেটা শুনে স্যারের স্বপ্ন আরও একধাপ বেড়ে যায় এবং স্যার গ্যাস ট্যাংকারে জয়েন করার জন্য লক্ষ্যস্থির করেন।

জহির স্যার ‘বেসিক গ্যাস ট্যাংকার’ কোর্স করার জন্য কাউকে না পেয়ে একা ৫ জনের খরচ বহন করেছিলেন। ইন্সটিটিউট এরপর জানায় গ্যাসের কোর্স করানোর জন্য কোন ইন্সট্রাক্টর নেই, স্যার কাউকে ম্যানেজ করতে পারলে তাহলেই সম্ভব। সৌভাগ্যক্রমে স্যারের পরিচিত একজন গ্যাস ট্যাংকার এক্সপেরিয়েন্সড সিনিয়র মেরিনার ছিলেন এবং স্যার অনেক রিকুয়েষ্ট করে উনাকে ক্লাস নিতে রাজি করিয়েছিলেন। এরপর সিওসিতে গ্যাস ট্যাংকার এন্ডোর্সমেন্ট নিতে গিয়ে দেখেন গ্যাস ট্যাংকার এন্ডোর্সমেন্টের সীলই নাই ডিজিতে যেহেতু গ্যাস ট্যাংকারে বাংলাদেশিরা সেভাবে সেইল করেনা। এরপর স্যারের অনুরোধে সপ্তাহখানেক পর নতুন সীল বানিয়ে ডিজি শিপিং থেকে এন্ডোর্স করা হয়। মানে, গ্যাস ট্যাংকারে জয়েন করার জন্য প্রতিটি পদে পদে স্যারকে নিজ উদ্যোগে সব করতে হয়। স্যারের জায়গায় আমি হলে এতসব ধকল নিতে পারতাম কিনা সন্দেহ আছে। হয়তো স্যারের প্রবল ইচ্ছাশক্তির জন্যই এতসব সহ্য করতে পেরেছিলেন।

জহির স্যার সিওসি পাবার পর গুগলে শুধু LPG/LNG Company খুঁজে খুঁজে ইমেইল পাঠাতে থাকেন। যদিও আশানুরূপ কোন রিপ্লাই পায়না কোথাও থেকে। এরপর আবার বাধ্য হয়ে একটা বাল্ক ক্যারিয়ারে জয়েন করেন জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে, এরপর অনবোর্ড ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার প্রমোশন। জহির স্যারের কাজে মুগ্ধ হয়ে কোম্পানির সুপারিন্টেন্ডেন্ট তার আরেক পরিচিত অন্য একটা ট্যাংকার কোম্পানির সুপারিন্টেন্ডেন্টকে রিকুয়েষ্ট করেন একটা সুযোগ দেয়ার জন্য এবং অনেক অপেক্ষার পর স্যার তার পরম আকাঙ্ক্ষিত ট্যাংকারে জয়েন করার সুযোগ পান। সেখানে থাকাবস্থায়ও উনি গ্যাস ট্যাংকারের টার্গেটে লেগে থাকেন এবং অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, একজন অত্যন্ত আন্তরিক সিনিয়রের প্রচেষ্টায় অবশেষে কাতার গ্যাস কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দেয়ার সুযোগ পান।

SSC-তে বরিশাল বোর্ডে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করা অত্যন্ত মেধাবী জহির স্যার ইন্টারভিউতে খুবই ভালো করেন এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে World’s largest LNG fleet owner, NAKILAT এর জাহাজে জয়েন করেন। যেহেতু এর আগে কোন বাংলাদেশি অফিসার নাকিলাতে ছিল না তাই স্যার জয়েন করার একমাস পরেই কোম্পানি থেকে তার পারফরম্যান্স জানতে চাওয়া হয় চিফ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে। জহির স্যারের মতো রত্ন চিনতে চিফ ইঞ্জিনিয়ার ভুল করেননি এবং স্যারের প্রাপ্য রিপোর্টই কোম্পানিতে দেয়া হয়। স্যারের পারফরম্যান্স এতই উল্লেখযোগ্য ছিল যে, ইন্ডিয়ান চিফ ইঞ্জিনিয়ার তাকে ‘এক্সেপশনালি ট্যালেন্টেড’ হিসেবে রিপোর্ট করেন।

জহির স্যার বাংলাদেশি অফিসারদের জন্য কাতার গ্যাসে একজন Pioneer এবং তার এমন একস্ট্রা অর্ডিনারী পারফরম্যান্সের জন্যই নাকিলাতে বাংলাদেশি মেরিনারদের জন্য একটা দরজা উন্মুক্ত হয়।

কিছুদিন আগে আমার এক ক্লোজ ব্যাচমেট কথাপ্রসঙ্গে বলেছিল যে, “মেরিন লাইনে চেষ্টা করলে আর লেগে থাকলে সবই হয় দেখেছি।” জহির স্যারের স্বপ্নপূরণের ঘটনাটি আমার ব্যাচমেটের কথার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

যা হোক, এ লেখাটি মূলত জহির স্যারের প্রতি ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাতে লিখেছি। উনি যে পরিমাণ স্ট্রাগল করেছেন গ্যাস ট্যাংকারের জন্য- আমাদের ধন্যবাদ এবং এপ্রিসিয়েশন তার প্রাপ্য। স্যারের এতসব স্ট্রাগল আর এচিভমেন্টের কথা সবাইকে না জানানোটা অন্যায় হবে বলে মনে হয়েছে আমার।

একইভাবে জহির স্যারের মতো আরও অসংখ্য বাংলাদেশি মেরিনার আছেন যারা এমন বহু নামি-দামি কোম্পানির দরজা খুলেছেন আমাদের জুনিয়রদের জন্য, আপনাদের প্রতিও অশেষ কৃতজ্ঞতা। আপনাদের মতো মেরিনারদের সুনামের জন্যই আমরা জুনিয়ররা এখনো অনেক জায়গায় সম্মানের সাথে কাজ করতে পারছি, যা আপনারা না থাকলে কখনোই সম্ভব হতো না।

এই লেখাটির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, জুনিয়রদের স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করা। জহির স্যারের মতো তোমরাও নিজের স্বপ্ন আর ইচ্ছায় অবিচল থাকো। তার মানে এই না যে, সবাইকেই অয়েল/গ্যাস ট্যাংকারে জয়েন করতে হবে। কারো স্বপ্ন থাকতে পারে বিদেশি কোম্পানি, কারো কার ক্যারিয়ার, কারো কেমিক্যাল ট্যাংকার, কারো হয়তো কন্টেইনার। যার যে স্বপ্নই আছে তা পুষে রাখো, পূরণ করতে অবিরাম চেষ্টা চালাতে থাকো, ইনশাআল্লাহ পজিটিভ কিছুই হবে। ক্যারিয়ারের শুরুতেই ভালো কোম্পানি কিংবা একাডেমিক স্কলারশিপ না পাওয়া মানেই সব শেষ না-সেটা মনে রেখো।

মেরিন একাডেমিতে থাকাবস্থায় সিনিয়ররা জিজ্ঞেস করতো, Juniors! Who will provide your job? আমরা জুনিয়ররা গলা ফাটিয়ে জবাব দিতাম, Honorable Senior sir! তখন মনে মনে ‘বুলশিট’ ভেবে হাসলেও এখন বুঝতে পারছি আসলেই আমাদের পাওয়া বেশিরভাগ জবগুলো অনারেবল সিনিয়র স্যারদেরই দেয়া, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে….

আমাদের মতো জুনিয়রদের জন্য নতুন নতুন পথ তৈরি করা প্রতিটি বাংলাদেশি মেরিনারের প্রতি হাজার সালাম আর অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতা ❤️

নিউজ লিংক: একজন স্বপ্নবাজ মেরিনারের গল্প


-আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৭/ই)

COMPILED BY
AKM Jamal Uddin

28th Batch, Marine Academy Bangladesh.

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

Recent Posts

Gallery

img_5530 11219104_10204906365351698_2052606970738551052_n.jpg IMG_1421 IMG_6340 480733010_28482619691382390_3549026143718209036_n IMG_0213

Related Articles

এক সমুদ্রচারীর সা‌থে চার দশক

সমুদ্রের বিচিত্র রূপ ও সমুদ্রচারীদের জীবন নিয়ে লেখা; বইটি পাওয়া যাবে একুশে...

Chowdhury Sadaruddin (19E): A Distinguished Bangladeshi-Australian Maritime Leader and Community Champion

Chowdhury Sadaruddin is a distinguished Bangladeshi marine engineer and a proud graduate...

শহীদ মিনারের জয় – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

তারপরে এলো সেই চরমক্ষণ। স্টল সাজানীতে বিজয়ী দলের নাম। দ্বিতীয় হলো ভারত;...

গরম তেলের ঝলসানি – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

অন্যান্য সবদিনের মতই, সেদিনও ইঞ্জিনরুমে কাজ করছি। হঠাৎ উপরে ছাদের দিকের একটা...