Home Articles শহীদ মিনারের জয় – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)
ArticlesRefayet Amin

শহীদ মিনারের জয় – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

তারপরে এলো সেই চরমক্ষণ। স্টল সাজানীতে বিজয়ী দলের নাম। দ্বিতীয় হলো ভারত; আর প্রথম হলো বাংলাদেশ। সারা হলভর্তি বাংলাদেশীদের উল্লাস ছড়িয়ে পড়লো। আমি মনে মনে আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ জানালাম, স্টুডেন্টদের অনেক বড় একটা সাধ পূরণ হয়েছে। আমি নিজে অনেক শান্তি পাচ্ছি; আমার কষ্ট স্বার্থক হয়েছে; কিন্তু তার থেকেও বেশী কষ্ট তো করেছে ছেলেমেয়েরা।

“বাবা, আমাদের বাংলাদেশী স্টুডেন্ট্‌স্‌ এসোশিয়েশানের জন্যে একটা শহীদ-মিনার বানিয়ে দিবে?”
“অবশ্যই। কখন লাগবে? কী উপলক্ষ্যে? কতবড় চাও?”
২০১৯ সালে আমার মেয়ে ঝোরা, কলম্বাসে ওহাইহো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ফোনে আবদারটা করলো। একমাত্র মেয়ে, তার উপরে এদেশের ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করবে, তাও আবার অন্যকিছু না, আমার চরম দুর্বলতা – ‘শহীদ-মিনার’ দিয়ে। না করবো কেনো?

ওদের ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত বিশ্বের সবদেশের স্টুডেন্টদের নিয়ে “Taste of OSU” নামে বাৎসরিক একটা অনুষ্ঠান করে। ফেব্রুয়ারীর তৃতীয় শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শুরু – মেলা বা মীনাবাজার টাইপের একটা ফেস্টিভ্যাল। প্রতিটা দেশের একটা করে স্টল থাকে, সেটাকে তারা নিজেদের মত করে সাজিয়ে নিজ দেশকে তুলে ধরবে – নিজেদের সংস্কৃতি, শিল্পকলা, ভাষা, প্রকৃতি, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি। সবশেষে থাকে নাচগানের অনুষ্ঠান। ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরাই দেশীয় পোষাকে সেজে, নিজেদের নাচগান পরিবেশন করে – কেউ লাইভ গানও করে; অনেকেই ইউটিউব বা অন্যান্য মিডিয়ার সাহায্য নেয়। শুধু গানই নয়, সেইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের বাদ্যযন্ত্র, বাঁশী-তবলা-ঢোল-গীটার সবকিছুর মাধ্যমে দেশকে তুলে ধরে। কিন্তু, অনুষ্ঠানের নামের সঙ্গে মিলিয়ে, সবচেয়ে আকর্ষনীয় ব্যাপারটাই হলো – প্রতিটা দেশের স্টলে তাদের নিজস্ব খাবার বিক্রী হয়। অনুষ্ঠানটা সকলের জন্যে উন্মুক্ত। প্রচুর জনসমাগম হয়। সকলে ভিন্ন ভিন্ন দেশের স্টল ঘুরে দেখে, খাবার কিনে খায়, আর সবশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করে।

অনুষ্ঠান শেষে বিজয়ী দেশের নাম ঘোষনা করা হয়। নাচগানে কোন দেশ সুন্দর করলো। কাদের খাবার সবচেয়ে মুখরোচক হলো, আর স্টল সাজানো ও দেশকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে কোন দেশ সবচেয়ে ভালো। ঝোরা জানালো, গত দু’তিন বছর ভারত স্টল সাজানোতে প্রথম হয়ে আসছে। এবারে (২০২০ সালে) টেস্ট অফ ওএসইউ হবেই ২১শে ফেব্রুয়ারীতে। বাংলাদেশী স্টুডেন্টরা তাই শহীদ-মিনার থিম করে স্টল সাজাবে। কিন্তু মিনার তো বানাতে হবে। ঝোরা তার বাপের নাম ভলিন্টিয়ার খাতায় লিখে দিয়ে, এখন আমাকে ফোন করেছে। তার বাপেরও অবশ্য এগুলোতেই উৎসাহ বেশী।

বছর দু’তিনেক হলো আমি আমার অনেকদিনের এক সুপ্ত ইচ্ছাপূরণ করতে গিয়ে, নিজের গ্যারেজকে একটা উড-ওয়ার্কশপে বানিয়ে তুলেছি। কেন জানিনা, আমার খুব শখ হতো কাঠের সুন্দর সুন্দর জিনিস বানাবো। এদেশে হবি হিসাবে অনেকেই এরকম করে, আর দোকানেও এগুলো বানানোর জন্যে অনেক যন্ত্রপাতিই পাওয়া যায়। আমিও শুরু করলাম। আগে একবার একটা টেবিল-টপ ছোট্ট শহীদ-মিনার বানিয়েছিলাম। তারপরে, আমার বাসা রি-মডেলিং-এর সময়ে, মিস্ত্রীর যন্ত্র ধার নিয়ে দু-তিনফুট উঁচু আরেকটা বানালাম। একটু নড়বড়ে হলেও প্রেজেন্টেবল। সেটা আমাদের শহরের ইউনিভার্সিটি অফ টলিডোর বাংলাদেশী স্টুডেন্ট্‌স্‌ এসোশিয়েশান নিয়ে বেশ কয়েক বছর একুশে ফেব্রুয়ারীতে ডিসপ্লে করেছিলো। এখন ঝোরাও চায় তার ইউনিভার্সিটির জন্যে।

আমিও বসে পড়লাম প্ল্যানিং এবং ডিজাইন করা নিয়ে। বেশ কয়েকটা পয়েন্ট মনে রাখতে হবে – প্রথমতঃ হাল্কা হতে হবে। দ্বিতীয়তঃ সহজেই খুলতে পারা যায় এমন হতে হবে, যাতে করে গাড়ীতে আনা-নেওয়ায় সুবিধা হয়। তৃতীয়তঃ – কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই সহজেই লাগানো ও খুলে ফেলা যায়। শহীদ-মিনারের দুপাশের চারটা (চার সন্তান) বানানো সহজ। চৌকোনা ফ্রেম বানিয়ে ফেললেই হলো। তবে, সন্তানদের আগলে রেখে ছায়াপ্রদানকারী মা বানাতে একটু ভিন্ন টেকনিকের আশ্রয় নিতে হয়। বিশেষ করে যখন কোণা করে উপরের অংশটা বানাতে হবে। তবে আগের অভিজ্ঞতাগুলো থেকে সেটাও সহজেই বানিয়ে ফেললাম। ফ্রেম বানালেই তো শেষ নয়, মাঝের রডগুলোও লাগবে। দোকানে চারফুট লম্বা এবং চিকন-মাঝারি-মোটা নানান সাইজের কাঠের ডাওয়েল (dowel) পাওয়া যায়। সেগুলোকেই ফ্রেমের উপরে নীচে ফুটা করে ছয়-সাতটা করে ঢুকিয়ে দিলাম। আবারো, চার সন্তানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সহজে হলেও, মা-এর ডিজাইনে, সেগুলোকে দুইভাবে বাঁধতে হলো। প্রথমে খাড়া সোজাসুজি নিয়ে একটা কাঠের পিসের মধ্যে আটকালাম; এরপরে কোণা করে আবারো উপরের দিকে টানলাম।

হয়তো, ঢাকার জাতীয় শহীদ মিনারের হুবহু স্কেলে তৈরী করতে পারিনাই, কিন্তু নিজের সীমাবদ্ধতার মাঝেই যা পারলাম, সেটাই বানালাম। সবচেয়ে ছোট মেম্বার দুইটা হলো আড়াই ফুটের, তারপরের দুইটা তিনফুট; আর মা হলো চার ফুট খাড়া হয়ে আবার একটু কোনাকুনি উঁচু।

গাড়িতে আনা-নেওয়ার সুবিধার জন্যে, প্রতিটার নীচে ছোট্ট চারকোনা একটা বেইস দিলাম, কিন্তু সেটাই ফাইনাল না। সেই বেইসগুলোতে ভারসম্য রেখে দাড়াতে পারবে না, ভীষন আনস্ট্যাবল হবে। এরপরে, কাঠ দিয়ে তিনটা বড় প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন করলাম – দুই পাশে দুইটা, আর মাঝখানে মায়ের জন্যে বড় একটা। সেগুলোতে বেইসের মাপমতো জায়গায় কেটে বাদ দিয়ে দিলাম। এর ফলে বড় প্ল্যাটফর্মকে মাটিতে বসিয়ে, সেই কাটা গর্তমত জায়গায় একটা একটা করে মেম্বার বসিয়ে দিলেই হলো – এরফলে, তারা ভালই স্ট্যাবল থাকবে।

আমার কাজ এখানেই শেষ করে দিলাম। ঝোরাকে বললাম, আমি তোমাদের এটা দিয়ে দিচ্ছি, এবারে তোমরা রঙ করে নিবে। ফ্রেমগুলো সাদা রঙের আর মাঝের ডাওয়েলগুলো (রড) কালো। স্টুডেন্টরা শহীদ-মিনার দেখে ভীষণ খুশী; আর তাতেই আমার জান ভরে গেলো – এ এক অন্য রকমের তৃপ্তি, সন্তুষ্টি। তাদের সঙ্গে ইমেইলে এবং ফোনে যোগাযোগ চলছিলো। কীভাবে সেট আপ করবে? কাঠের উপরে কী ধরনের রঙ দিতে হয়? কোন ব্রাশ? মাঝে একদিন জানালো, তাদেরকে শহীদ-মিনারটা কীভাবে বানানো হয়েছে, তার বর্নণাও লিখতে হবে। এটাও প্রতিযোগীতার অংশ। কী কাঠ ব্যবহার করেছি? কোন ধরনের মেশিন ও করাত? কতদিন লেগেছে? সব তথ্য জানালাম। তারা সেগুলোকে নিজেদের মত লিখে নিয়ে জমা দিলো।

২০২০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী শুক্রবার। আমরা কাজ শেষ করে কলম্বাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। দুই ঘন্টা লাগে এই দেড়শ’ মাইল যেতে (সোয়া দুইশ’ কি.মি.)। গিয়ে দেখি সে কি উৎসবমুখর পরিবেশ! ওহাইহোর ফেব্রুয়ারী মানেই চরম শীত, তাই সব অনুষ্ঠানই বিল্ডিঙয়ের ভিতরে।। বড় হলঘরের ভিতরে, দেশগুলোর স্টল সাজানো। লাউডস্পীকারে বিভিন্ন দেশের গান বাজছে। সারা হলঘর খাবারের গন্ধে ভরপুর। আমরা ঘুরেফিরে দেখে, এখান থেকে একটু, অন্যখান থেকে আরেকটা আইটেম, এভাবে মিলিয়ে-মিশিয়ে চেখে খেয়ে দেখছি। তবে আমাদের চোখ আর মন তো রয়েছে বাংলাদেশী স্টলের দিকেই। স্টুডেন্টরা খুবই যত্ন করে, অসম্ভব সুন্দর সাজিয়েছে। বড় একটা বাংলাদেশী পতাকার ব্যাকগ্রাউন্ডের সামনে বেদীমত বানিয়ে শহীদ-মিনার দিয়েছে। অনেক লাল-সাদা গোলাপফুল সাজিয়েছে। শীতকালে তাজা ফুলের বদলে প্লাস্টিকের হলেও, দেখতে সুন্দর লাগছে। স্টলে ঢুকার পথে ডেকোরেটিভ আর্চ-পিলার দেওয়ায় আরো বৈশিষ্ট্যময় হয়ে উঠেছে। নিজের দেশ বলে তো অবশ্যই ভালো লাগছে। কিন্তু মনে হলো আসলেই স্টুডেন্টদের অনেক কষ্ট হলেও খুবই আকর্ষনীয়, এবং সত্যিকারের প্রশংসার দাবীদার।

ভারতের স্টলও ঘুরে দেখে এলাম। তারা বানিয়েছে গ্রামদেশে আড্ডার জায়গা মত করে চা-এর স্টল বা টং। প্রতিবছরই তারা সেটা করে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের হস্তশিল্প দিয়ে সাজায়। চা-এর ব্যবস্থাও থাকে। অ্যামেরিকান পরিবেশে চিন্তা করলে, ব্যতিক্রমী এবং অবশ্যই সুন্দর। সেখানে চার-পাঁচজন বসে বসে আড্ডা মারছে, চা খাচ্ছে।

এক পর্যায়ে নীচে উন্মুক্ত লবীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হলো। খুবই সুন্দর, খুবই উপভোগ্য। কতদেশের কতকিছু দেখলাম, যা দেখি যা শুনি, সবকিছুই ভাল লাগে। অনুষ্ঠানের শেষে, এবারে শুরু হলো বিজয়ী দলের নাম ঘোষনা। এক এক করে সব নাম বলতে থাকলো। সবাইকেই কৃতিত্ব দিলো, উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলো সবার। তারপরে এলো সেই চরমক্ষণ। স্টল সাজানীতে বিজয়ী দলের নাম। দ্বিতীয় হলো ভারত; আর প্রথম হলো বাংলাদেশ। সারা হলভর্তি বাংলাদেশীদের উল্লাস ছড়িয়ে পড়লো। আমি মনে মনে আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ জানালাম, স্টুডেন্টদের অনেক বড় একটা সাধ পূরণ হয়েছে। আমি নিজে অনেক শান্তি পাচ্ছি; আমার কষ্ট স্বার্থক হয়েছে; কিন্তু তার থেকেও বেশী কষ্ট তো করেছে ছেলেমেয়েরা। তারা যেন চিরকাল শহীদ-মিনারের এই সম্মান দেশে ও বিদেশে বজায় রাখতে পারে।


টলিডো, ওহাইও, ২০২২
refayet@yahoo.com

 

COMPILED BY
AKM Jamal Uddin

28th Batch, Marine Academy Bangladesh.

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

Recent Posts

Gallery

188507_1823634423154_5805542_n BMCS Badminton  (7).jpg DSC_0927 1 Aussie (1) Mariners Night_CTG (5) IMG_0315

Related Articles

Bangladesh’s port development: Why the right contractual model matters: Md Mostafa Aziz Shaheen (45N)

The future development of Bangladesh’s seaports requires more than investment in physical...

Merchant Ship Breaking – Mubashir Ahmed Khan (2E)

In addition to English, I write in Urdu also. Recently my article...

এক সমুদ্রচারীর সা‌থে চার দশক

সমুদ্রের বিচিত্র রূপ ও সমুদ্রচারীদের জীবন নিয়ে লেখা; বইটি পাওয়া যাবে একুশে...

Chowdhury Sadaruddin (19E): A Distinguished Bangladeshi-Australian Maritime Leader and Community Champion

Chowdhury Sadaruddin is a distinguished Bangladeshi marine engineer and a proud graduate...