বাংলাদেশে মেরিন শিক্ষা – ক্যাপ্টেন শামস উজ জামান (11N)

বাংলাদেশে মেরিন শিক্ষা – ক্যাপ্টেন শামস উজ জামান (11N)

ব্রিটিশ ভারতে জাহাজের অফিসার বলতে দু-একজন ভারতীয় অফিসার ছাড়া ইংরেজরাই মূলত কাজ করত। তবে কলকাতা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালিসহ পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের অন্য দুএকটি জেলার লোকজন জাহাজের খালাসি হিসেবে কাজ করত। সে সময় বম্বে শহরে অবস্থিত ‘ডাফরিন’ নামে একটি প্রশিক্ষণ জাহাজ ছিল যেখানে ‘মার্চেন্ট নেভি’ ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

ভারত ভাগের পর পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশন (পিএনএসসি) নামে একটি জাহাজ কোম্পানি গড়ে তোলা হয় এবং পরবর্তীতে কলম্বো প্লানের আওতায় তদানীন্তন পাকিস্তানের কিছু যুবক বিলেতের “ওয়েস্টার” এবং ভারতের “ডাফরিন” বাণিজ্যিক নৌ-ক্যাডেট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে পড়াশোনা করে পরবর্তীতে জাহাজের অফিসার হিসেবে গড়ে ওঠেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার অধীনে জুলদিয়া নামক স্থানে কর্ণফুলী নদীর কিনার ঘেঁষে একটি মেরিন একাডেমি গড়ে তোলা হয়। সে একাডেমিতে সে সব দিনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নটিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রাঞ্চে ২২ জন করে ক্যাডেটের লেখাপড়া করার ব্যবস্থা ছিল। সে সময়ে একাডেমিতে ইরান এবং মালয়েশিয়া থেকে আগত দুচারজন ক্যাডেটও পড়াশোনা করত।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি প্রেসিডেন্সিয়াল অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমির কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়। পরবর্তীতে এসব ক্যাডেট বিএসসির জাহাজে সি টাইম শেষ করে বিলেত, হংকং, সিঙ্গাপুর এবং আয়ারল্যান্ডের মতো দেশে গিয়ে উচ্চতর সার্টিফিকেটগুলো (সার্টিফিকেট অব কমপিটেন্সি-সিওসি) সম্পন্ন করে বিএসসিকে একটি দেশীয় অফিসারসমৃদ্ধ জাহাজ কোম্পানি হিসেবে গড়ে তোলেন। তার আগে বিএসসি জাহাজের উচ্চতর পদগুলো বিদেশিদের দ্বারা পূরণ করা হতো। এসব অফিসারের অনেকেই তখন বিদেশি নামি-দামি কোম্পানির জাহাজেও সুনামের সঙ্গে কাজ করতেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের দিকে বাংলাদেশে পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপিত হলে ক্যাডেটদের অনেকেই বাংলাদেশ থেকে সিওসি নিতে শুরু করেন, যা অদ্যাবধি কার্যকর আছে।
বাংলাদেশ পরবর্তী সময় থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সময়, বিএসসির চাহিদা বিবেচনা করে মেরিন একাডেমির ছাত্রসংখ্যা কমবেশি ১৬ থেকে ৫০ এর ভেতরে ওঠানামা করেছে। ১৯৯৯ সালের দিকে বিএসসির জাহাজ সংখ্যা ছিল কমবেশি ৩০টি। এ সময় থেকে শুরু করে ২০০৮ সাল পর্যন্ত একাডেমির ছাত্রসংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু ২০০৮ সাল পরবর্তী সময়ে বিদেশি জাহাজ কোম্পানিতে বেশি সংখ্যক ‘সি ফেয়ারারের’ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে এমন ধারণা থেকে ২০১৩ সাল নাগাদ মেরিন একাডেমির ছাত্রসংখ্যা আস্তে আস্তে বাড়িয়ে ৩০০র কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়। পাশাপাশি পাঁচ-সাতটি নতুন ব্যক্তিমালিকানাধীন মেরিন একাডেমি খোলার অনুমতি প্রদান করা হয়। মূলত এ সময় থেকেই সরকারি-বেসরকারি একাডেমিগুলো থেকে প্রতিবছর কমবেশি ৭০০-৮০০ নতুন ক্যাডেট বাজারে প্রবেশ করে এবং সি টাইম শেষ করার জন্য এসব ক্যাডেটের ‘জাহাজ না পাওয়ার’ সমস্যা শুরু হয়। পরবর্তী দুই-তিন বছরের মধ্যে এ সমস্যা আরো প্রকট হয়ে ওঠে। এ সময় লোকসানজনিত কারণে বিএসসির অবস্থাও ক্ষয়িষ্ণু। তাদের জাহাজ সংখ্যা তখন দুই-চারটিতে নেমে এসেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সরকার ২০১৬ সালে প্রাইভেট মেরিন একাডেমির (দুএকটি ছাড়া) কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় এবং ২০১৭ সাল থেকে মেরিন একাডেমির ছাত্রসংখ্যা কমিয়ে পঞ্চাশের কোঠায় নিয়ে আসে। বিবেচনাপ্রসূত এমন সিদ্ধান্তের ফলে অচিরেই ক্যাডেটদের জাহাজ না পাওয়ার বন্ধ্যাত্ব অনেকটাই কাটিয়ে ওঠে। তবে কিছুদিন আগে প্রকাশিত একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তি দেখে কিছুটা হলেও অবাক হয়েছি। এবছর থেকে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি, ফিশারিজ একাডেমি, নতুন চারটি সরকারি মেরিন একাডেমি এবং আরো পাঁচটি বেসরকারি মেরিন একাডেমিতে (সর্বমোট ১১টি) প্রায় ৮০০ ছাত্র ভর্তি করানো হবে। চাহিদার তুলনায় এত বিপুল সংখ্যক ছাত্র পাশ করিয়ে এসব ক্যাডেটকে আবারও ২০১৩ সাল পরবর্তী সময়ের মতো বিপদে ফেলা হবে না তো?
আমার জানা মতে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান এমন কি আফ্রিকার দেশগুলোতেও প্রতিবছর চাহিদার বিপরীতে মেরিন কলেজ-ইউনিভার্সিটি বা একাডেমিগুলোতে ছাত্রসংখ্যা বাড়ানো-কমানো হয়। এ বিষয়টির দিকে আমাদেরও খেয়াল রাখা উচিত। বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির কমান্ডেন্টের একান্ত চেষ্টায় বর্তমানে বিদেশি কিছু কোম্পানিতে জনাচল্লিশেক ক্যাডেটের সি টাইম করার ব্যবস্থা হয়েছে। এ চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ধরনের একটি কার্যক্রমের মাধ্যমে ভিয়েতনাম তাদের দেশ থেকে ৩ হাজারের মতো মেরিন ক্যাডেটের বিদেশি জাহাজে চাকরির ব্যবস্থা করেছে। এ বিষয়ে ‘ম্যানিং এজেন্ট’দের ভূমিকা রাখতে হবে। তবে বাংলাদেশি মেরিনারদের বিদেশি ভিসা পেয়ে জাহাজে ওঠা-নামার সমস্যা ছাড়াও বেশ কিছু ম্যানিং এজেন্টদের ব্যাপারে বাজারে শ্রুতি আছে, এসব এজেন্ট টাকার বিনিময়ে ক্যাডেট পাঠানোর পর তাদেরকে দিয়ে জাহাজে ওয়েলার, ওএস (জাহাজের ক্রু)-এর কাজ করানো হয়। জাহাজ না পেয়ে প্রচণ্ড মানসিক চাপ এবং কিছু টাকা কামাই করার জন্য এসব ক্যাডেট এ কাজ করতে বাধ্য হয়। বিষয়টি সত্য হলে এটি নিন্দনীয়, অনৈতিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে বেআইনি কাজ।
উপযুক্ত ট্রেনিং-এর অভাবে এসব ক্যাডেটের অনেকেই পরবর্তীতে সিওসি পাশ করে জাহাজের অফিসার হিসেবে কাজে যোগ দিয়ে অনভিজ্ঞতাজনিত কারণে জাহাজ থেকে নেমে আসতে বাধ্য হয়। বিষয়টি দেশের জন্যও লজ্জাকর। ‘ক্যাডেট প্লেসমেন্ট’ এবং জুনিয়র অফিসারদের চাকরির বিষয়টি সুরাহা হলে মেরিন শিক্ষার বিষয়ে নিচে উল্লেখিত বিষয়গুলোর দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

১) প্রতিটি একাডেমিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে চালাতে হবে। সেক্ষেত্রে এসব একাডেমির অবকাঠামোগত সুবিধাসহ প্রশিক্ষিত ইনস্ট্রাক্টর, আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ যন্ত্রপাতি থাকা জরুরি। সরকার চাইলে এতগুলো মেরিন একাডেমি চালু না করে একমাত্র বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির (অনুমোদিত ছাত্রসংখ্যা ৫০০) ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি করার কথাও ভাবতে পারতেন। আরো একটি বিষয়— যেনতেন ছাত্রের পক্ষে মেরিনে ক্যারিয়ার বানানো সম্ভব নয়। আমার মনে আছে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে, সমস্ত দেশজুড়ে পরীক্ষা নিয়ে আমাদের কমান্ডেন্ট সে বছর একাডেমিতে মাত্র ২৬ জন ক্যাডেট ভর্তি করিয়েছিলেন, যদিও সে সময় একাডেমির সিটসংখ্যা ছিল ৪৪টি। ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে তিনি মনে করেছেন—এই ২৬ জন ছাড়া অন্যরা ‘সি ক্যারিয়ার’ বানানোর যোগ্যতা রাখে না।
এখানে উল্লেখ্য, গেল বেশ কিছু বছর ধরে একাডেমি থেকে পাশ করে সময়মতো সি টাইম শেষ করার সুযোগ না পাওয়ার কথা মাথায় রেখে বর্তমানে ভালো ছাত্রদের অনেকেই মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। সেক্ষেত্রে মেধাবী ছাত্র না পেলে প্রয়োজনে ভর্তি কোটা খালি রাখাই সমীচীন।

২) বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির (বিএসএমএমইউ) আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। এ ব্যবস্থাটি বেসরকারি মেরিন একাডেমিসহ অন্য সব সরকারি একাডেমির ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। উপরন্তু, একটি স্বতন্ত্র ‘মেরিন ক্যাডার’ সার্ভিসের ব্যবস্থা করা গেলে এসব ছাত্রের অনেকেই বিসিএস পরীক্ষা পাস করে সচিবালয়, আইডব্লিউটিএ, আইএমও, ডিজি শিপিং, বিআইডব্লিউটিসি, সরকারি মেরিন একাডেমি এবং বিএসসিসহ বন্দর পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারবেন।

৩) সিওসি গ্রহণ করা অফিসারদের ব্যাপারেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। বিদেশি জাহাজে চাকরি না হলে এসব অফিসারের অনেকেই বেকার হয়ে বসে থাকবেন যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এখানে উল্লেখ্য, অনেক পাশকরা জুনিয়র অফিসার বর্তমানে জাহাজে চাকরি না পেয়ে বেকার হয়ে বসে আছেন।

৪) পরিশেষে ঢাকায় অবস্থিত সিওসি পরীক্ষা কেন্দ্রটির অবকাঠামোগত অবস্থা নিতান্তই নাজুক। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠে এ কেন্দ্রটিকে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনাসহ একটি আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষা কেন্দ্রে উন্নীত করাও একান্ত জরুরি।

The Daily Ittefaq, 17 Nov 2019

লেখক :মেরিন ক্যাপ্টেন, শিপ সার্ভেয়ার এবং কনসালটেন্ট

Share