Home Articles সমুদ্রের জীবন, জীবনের সমুদ্র – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)
ArticlesRefayet Amin

সমুদ্রের জীবন, জীবনের সমুদ্র – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

১৯৮৫ থেকে শুরু ’৯৫ পর্যন্ত, জীবনের দশটি বছর কাটিয়েছি লোনা জলের উপরে লোহার জমিনে খোলা হাওয়া খেয়ে। আজও মাঝে মাঝে মনে হয় ফিরে যাই সেই জীবনে। সে এক অদ্ভুত ভিন্নধরনের জীবন – পুরাপুরি ছন্নছাড়াও বলা যাবে না, কারন মেরিনারদেরকে জাহাজে অনেক নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়; আবার সাধারন কোন মানুষের জীবনের সঙ্গে একজন মেরিনারের জীবনেরও তুলনা করা যাবে না। আকাশ-পাতাল তফাৎ; বা মেরিনার-ভাষায় বলতে হয় – আটলান্টিক-প্যাসিফিক তফাৎ।

পঁচাশিতে আমার মেরিনার-জীবনের শুরু হয়, কিন্তু তার আগেও গোড়া আছে। সেই ১৯৭৪ সালের কথা, আমি পড়ি ক্লাস ফোরে। আম্মার এক দূর-সম্পর্কের ভাই লনিমামা, মংলা ও চট্টগ্রাম পোর্টের দুটাতেই কোন এক বড় পোস্টে কাজ করতেন। থাকতেন খুলনায়; কিন্তু চট্টগ্রামে কাজের জন্য এলে, আমাদের বাসায় প্রায় বিকালেই বেড়াতে আসতেন। তিনি একবার বাসায় এসে গল্প করছিলেন তার দেশ-বিদেশ ভ্রমণের সব বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা। যুদ্ধ-পরবর্তী চুয়াত্তরে সাধারণ বাংলাদেশীদের পক্ষে বিদেশ-ভ্রমণ মানে চাঁদে যাওয়ার সমান। যাহোক গল্পের এক পর্যায়ে লনিমামা নরওয়ের রাজধানীর নাম ভুলে গেলে, আমি ধরিয়ে দিয়েছিলাম। এতটুকু এক ছেলে, Oslo বলতে পেরেছে দেখে উনি বেশ ইম্প্রেস্‌ড্‌। মামা খুবই খুশী হয়ে আমাকে বললেন কাল তোমার জন্য দুটা সারপ্রাইজ আছে। পরেরদিন লনিমামা যখন এলেন, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন Quality Streets, Cadbury-র চকোলেটের দুইটা বাক্স। জীবনে সেবারই প্রথম দেখলাম এতো সুন্দর চকলেট। দেশে তখন ছিলো শুধুই দুই পয়সার লজেন্স বা টফি, বা কটকটি মিঠাই, লাল-তুলা (cotton candy) পেতাম। এরকম রঙিন রাঙতায় মুড়ানো চকলেট ক্যান্ডি তখনকার যুগে ছিলো চিন্তারও বাইরে। লাফালাফি পড়ে গিয়েছিলো সকলের মধ্যে এত সুন্দর ক্যান্ডি দেখে। কিন্তু মামা তখনো আরো বড় একটা সারপ্রাইজ দিতে বাকি রেখেছিলেন। তিনি বললেন, আগামীকাল আমাদের তিনি জাহাজে ঘুরতে নিয়ে যাবেন।

বইয়ের ছবিতে আর সিনেমাতে জাহাজ দেখা ছাড়াও, চটগ্রামের ছেলে হওয়ার সুবাদে আমরা পতেঙ্গা আসা যাওয়ার পথে জাহাজ দেখেছি অনেক। কিন্তু মামা বললেন তিনি জাহাজের উপরে নিয়ে যাবেন। আমাদের খুশী তো আর ধরে না। আমাদের শ্রদ্ধেয় আব্বা, সেই পঞ্চাশের দশকে লন্ডনে পিএইচডি করার সময়ে, একবার দেশে ফেরত এসেছিলেন জাহাজে চড়ে। পারিবারিক গল্পের আসরগুলোতে সেটা ছিলো একটা হিট গল্প। আব্বা বলতেন, সমুদ্রের কথা, জাহাজের দুলুনির কথা, Bay of Biscay-র প্রচন্ড ঝড়-ঝঞ্জার কথা, আর জাহাজের মজার মজার খাওয়া-দাওয়ার কথা। আমরা অবাক বিস্ময়ে শুনতাম। কল্পনায় কত কিছু চিন্তা করে নিতাম। এছাড়া জাহাজে চড়া বলতে আমরা নানাবাড়ি রাজশাহী যাওয়ার পথে আরিচা-নগরবাড়ির ফেরিতে উঠে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতাম। এখন মামা আমাদের সত্যি সত্যি একটা জাহাজে নিয়ে যাবেন। ভাবতেই খুশীতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। পরদিন এক মাইক্রোবাসে করে আম্মাসহ আমরা কয়েকজন রওনা দিলাম চিটাগাং পোর্টের দিকে। যতদূর মনে পড়ে, শ্রদ্ধেয় খালা মিসেস মুশতারী শফির বড় মেয়ে আমাদের প্রিয় ইয়াসমিন আপাও ছিলেন; আর ছিলো আপাদের খালাতো ভাই কুন্তল।

আমরা প্রায় সাত-আটজনের একটা গ্রুপ মিলে ঘুরে এলাম বাংলার প্রগতি নামের এক জাহাজ। আমি মনে হয় তখনই বিমোহিত হয়ে গেলাম; এবং আমার জীবনের লক্ষ্য সেদিনই ঠিক করে ফেললাম। সেই জাহাজে ছিলো একজন বৃটিশ ক্যাপ্টেন; কিন্তু তার থেকেও বেশী ইম্প্রেস্‌ড্‌ হয়েছিলাম জাহাজে কয়েকজন বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী বাংলাদেশী অফিসারদের দেখে। সুন্দর ইউনিফর্ম, সুন্দর কথাবার্তা, দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর গল্প, আর সর্বোপরি জাহাজের মত রোমাঞ্চকর এক জগতে তাদের বসবাস। আমার আর কিছুই চাই না, আমিও বড় হয়ে বিশাল সমুদ্রে এরকম জাহাজে করে ঘুরে বেড়াবো – আমি হবো একজন মেরিনার। কলম্বাস, ভাস্কো-ডা-গামা, ম্যাগেলান, ক্যাপ্টেন কুক, কতজনকেই তো বই পড়ে চিনেছি জেনেছি। আমি তাদের মতোই নীল সমুদ্রে ভেসে ভেসে বেড়াবো। ক্লাস ফোরের দশ বছরের সেই ছেলেটির চোখে তখন থেকেই নীল সমুদ্রের হাতছানি লেগে গেলো।

ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুবাদে একবার দুইবার নেভীর জাহাজে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো। এছাড়াও কলেজের ভাইরা পাশ করে অনেকেই মেরীন একাডেমীতে যেতেন, তাদের সঙ্গেও দেখা-সাক্ষাৎ হলে অনেক আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করতাম। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার আগে কলেজের প্রিন্সিপ্যাল, আর্মীর লেফটেন্যান্ট-কর্নেল আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন – আমার কী পড়ার ইচ্ছা? মেরিন-এর কথা বলায়, তিনি হতাশ হয়েছিলেন এবং আমাকে বিরত করার চেষ্টাও করেছিলেন। অনেক জোরজার করেছিলেন আমাকে আর্মীতে ঢুকানোর জন্য। কিন্তু, ঐ যে আমার মাথায় তো একবার ঢুকেই গেছে, মেরিনে যেতে হবেই হবে। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে, ভর্তি পরীক্ষায় মেডিক্যাল, বুয়েট মেরিন তিনটাতেই টিকে গেলাম; কিন্তু অন্য দুইটাকে টা-টা, বাই-বাই বলে ১৯৮৩ সালের অক্টোবারে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার নদীর অন্যতীরে জুলদিয়ার মেরিন একাডেমীতে জয়েন করলাম।

একাডেমী থেকে পাশ করে জাহাজে জয়েন করে দশটা বছর কাটিয়েছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে, বন্দরে বন্দরে। কাজ করেছি বিশ্বের বিভিন্ন জাহাজ কোম্পানীতে। এর মাঝে ইংল্যান্ড থেকে প্রফেশানাল পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে করে প্রথমে সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার, এবং পরে চীফ ইঞ্জিনিয়ারও হয়ে গেলাম। ১৯৯৩ সালে বিয়ে করার পর থেকেই মনে হচ্ছিলো, এবারে আমার ভবঘুরে মেরিনার জীবন শেষ করে কোথায়ও স্যাটল্‌ হই। সেই মত কানাডার মন্ট্রিয়েল থেকে মাস্টার্স শেষ করে, অ্যামেরিকার ওহাইহো স্টেটের টলিডো শহরের সাবার্ব, হল্যান্ডে গত পঁচিশ বছর কাটিয়ে দিলাম। এখানে আর সেই মেরিনার রইলাম না। ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে থাকলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মেশিনারিজ নিয়ে কাজকর্ম করলাম প্রায় দশ-পনের বছর। সেটার পরে এখন এই গত দশ বছর ধরে বাসায় থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সালটেন্সীর কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

তবে এখনো সেই সমুদ্রের জীবন মাঝে মাঝে মিস্‌ করি। বিশেষ করে ফেসবুকের কল্যানে এখন দেখতে পাই বর্তমানে যারা জাহাজে আছে, তারা কী সুন্দর সুন্দর ছবি পোস্ট করে বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরের। এককালে আমিও সেগুলোতে যেতাম। তখনকার দিনে ক্যামেরায় ছবি তুলে প্রিন্ট করেছি; কিন্তু ফেসবুকে দিয়ে সকলের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি নাই। বছর খানেক আগে আসমা বীথীর সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। অনেকদিন লেখালিখি করিনাই বলে আমাকে উনি আইডিয়া দিলেন – আমার জাহাজের জীবনের কথা, আমার বর্তমান কাজের কথা, আমাদের এখানের বাংলাদেশীদের কথা – এগুলো নিয়ে লিখতে। এগুলোর প্রতিটা ব্যাপারেই সাধারন মানুষের মনে ভাসা ভাসা ধারনা মাত্র আছে। অনেকেই নানা জনের মুখ থেকে এগুলো সম্পর্কে শুনে থাকে। তবে সবচেয়ে বেশী যেটা হয় যে, অনেক অনেক ভ্রান্ত ধারনা চলে আসে এগুলো সম্পর্কে। চেষ্টা করবো, আমার নিজের সেই অতীতের জাহাজ-জীবনের ঘটনাবলীর মাধ্যমে আপনাদের এই সমস্ত বিষয়ে কিছু কিছু জানাতে। আশাকরি, আমার একপেশে দৃষ্টির লেখনীতে একঘেঁয়েমীতে ভুগবেন না।

আজকে শেষ করার আগে একটা মজার তথ্য দেই – জাহাজে অনেক কিছুর নামই ভিন্ন; এই যেমন ধরুন জাহাজের জানালাকে window বলা হয় না, porthole বলে এটা হয়তো অনেকেই জানেন। কিন্তু আরো একটা ব্যাপার আছে – পোর্টহোল সবসময়ই গোল বা ওভ্যাল আকারের হয়। চারকোণা হয় না। চৌকো শেইপের হলেও কোণা থাকতে পারবে না। মানে বাসা-বাড়ির সাধারন জানালার মত (বা ফটোফ্রেমের মত), পোর্টহোলের কোনো শার্প কোণা নাই – থাকলে সেখান দিয়ে জাহাজের স্ট্রাকচার ক্র্যাক করে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে – সমূহ বিপদ। এরকম হাজার হাজার খুঁটিনাটি ব্যাপার-স্যাপার আছে জাহাজে – ধীরে ধীরে সব বলবো। আচ্ছা – গ্যাংওয়ে (gangway) কী জানেন? পরে এক সময়ে জানাবো। আমার একটা অনুরোধ – কারো যদি কোনো বিষয়ে কোনো কৌতুহল থাকে, তাহলে আমাকে refayet@yahoo.com ই-মেইলে যোগাযোগ করতে পারেন।
সমুদ্রের জীবন, জীবনের সমুদ্র – দৈনিক আজাদী (dainikazadi.net)


রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই), টলিডো, ওহাইও, ২০২২
refayet@yahoo.com

COMPILED BY
A.K.M Jamal Uddin

28th Batch, Marine Academy Bangladesh.

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

Recent Posts

[Not a valid template]

Related Articles

এক সমুদ্রচারীর সা‌থে চার দশক

সমুদ্রের বিচিত্র রূপ ও সমুদ্রচারীদের জীবন নিয়ে লেখা; বইটি পাওয়া যাবে একুশে...

Chowdhury Sadaruddin (19E): A Distinguished Bangladeshi-Australian Maritime Leader and Community Champion

Chowdhury Sadaruddin is a distinguished Bangladeshi marine engineer and a proud graduate...

শহীদ মিনারের জয় – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

তারপরে এলো সেই চরমক্ষণ। স্টল সাজানীতে বিজয়ী দলের নাম। দ্বিতীয় হলো ভারত;...

গরম তেলের ঝলসানি – রেফায়েত ইবনে আমিন (২০ই)

অন্যান্য সবদিনের মতই, সেদিনও ইঞ্জিনরুমে কাজ করছি। হঠাৎ উপরে ছাদের দিকের একটা...